ads

গোয়েন্দা বাহিনীর মাধ্যমে ভারতের গোপন যুদ্ধের কাহিনী

ভারত

ভারতের গোপন যুদ্ধ

 

 

২০১৬ সালের ৩ মার্চ পাকিস্তানের হাতে গ্রেফতার হয় ভারতীয় গুপ্তচর কূলভূষণ যাদব। এক যুগেরও বেশি সময় ব্যবসায়ীর ছদ্মবেশে ইরানের চাবাহার শহরে অবস্থান করে পাকিস্তানে গুপ্তচরবৃত্তি করেছে সে। একটি সামরিক আদালতে মৃত্যুদণ্ড হওয়া যাদবের বিষয়টি নিয়ে পাক-ভারত কূটনৈতিক বিরোধ নতুন করে জেগে উঠেছে। যাদব নিজেকে ভারতীয় নৌবাহিনীর কমিশনপ্রাপ্ত অফিসার ও গোয়েন্দা সংস্থা র-এর এজেন্ট দাবি করলেও ভারত তা অস্বীকার করে। এরই মধ্যে ভারতের প্রভাবশালী ‘দ্য হিন্দু’ পত্রিকার মালিকানাধীন ম্যাগাজিন ফ্রন্টলাইনে যাদবের অতীত ইতিহাস, পেশাগত জীবন, গুপ্তচরবৃত্তি নিয়ে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন লিখেছেন প্রবীণ স্বামী

 

 
ছয় ঘণ্টা ধরে ঘন জঙ্গলে ঢাকা পথে একটানা চলেছে গাড়িটি। ইরানের সিস্তান-বালুচিস্তান প্রদেশের বড় পাহাড়গুলোর পাদদেশ থেকে শুরু হওয়া ঘন জঙ্গলের মধ্য দিয়ে বয়ে চলা এই পথটি কয়েক প্রজন্ম ধরেই চোরাকারবারি, বিদ্রোহী আর গুপ্তচরদের নিরপদ রুট হিসেবে পরিচিত। ইরানের সারাভান শহরের দিকে যাচ্ছে ভাড়া করা গাড়িটি। ইরান-পাকিস্তান সীমান্ত থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে ৫০ হাজার জনসংখ্যার ছোট্ট শহর সারাভান। গাড়ির আরোহী মুম্বাই থেকে আসা এক ব্যবসায়ী, যিনি একটি মিটিংয়ে অংশ নিতে যাচ্ছেন। যাদের সাথে দেখা করতে যাচ্ছেন তারা অপেক্ষায় আছে; কিন্তু তার জন্য অপেক্ষায় ছিল আরো একটি দল (পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনী)। তাই গোয়েন্দা জগতের দশটি কাহিনীর মতোই এই গল্পও শেষ হলো বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে (কূলভূষণকে তুলে দেয়া হলো পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে)।

 
ভারত জানত এরপর কী ঘটতে যাচ্ছে : কূলভূষণের মাথার ওপর এখন মৃত্যু পরোয়ানা ঝুলছে, যেটি কার্যকরের অপেক্ষায়। পাকিস্তানের একটি সামরিক আদালতে তড়িঘড়ি করে সম্পন্ন করা বিচারে তাকে গুপ্তচরবৃত্তির দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।

 

 
গত জানুয়ারির শুরুর দিকে পাকিস্তানের একটি টিভি চ্যানেলে প্রচারিত হয় যাদবের বক্তব্য। সেখানে তিনি জোর দিয়েই বলেছেন, তিনি ভারতীয় নৌবাহিনীর কমিশনপ্রাপ্ত অফিসার। যদিও এই বক্তব্যটি ভারত সরকারের বক্তব্যের সম্পূর্ণ বিপরীত। তবে তার কর্মকাণ্ডের সাথে বক্তব্যটি সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল।

 
প্রকৃতপক্ষে যাদবের পরিচয় কী কিংবা সে কোথায় ছিল তা অস্পষ্ট। এ বিষয়ে মৌলিক কিছু প্রশ্নের উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। সরকারি নথিগুলোও প্রকাশ করা হচ্ছে না। তবে তিনটি দেশের দশজনের বেশি কূটনীতিক ও গোয়েন্দা এবং ভারতীয় নৌবাহিনীর কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎকার নেয়ার পর এটি স্পষ্ট হয়েছে যে, ভারত ও পাকিস্তান কোনো দেশের সরকারই পুরোপুরি সত্য কথা বলছে না।

 
যাদবের ভাগ্যে কী ঘটবে সে বিষয়টির চেয়েও এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর নেপথ্যে রয়েছে এমন এক গোপন যুদ্ধ যা শত শত, এমনকি হাজারো মানুষের জীবন ধ্বংসের কারণ হতে পারে।

 

 
২০১৩ সালের পর থেকেই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে একটি গোপন অ্যাকশন প্রোগ্রাম হাতে নিয়েছে ভারত। উগ্রপন্থীদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেয়া ও ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্সের (আইএসআই) ভেতর থাকা এদের পৃষ্ঠপোষকদের নিবৃত্ত করাই এর লক্ষ্য। অতীতে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল ও বর্তমানে রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস ওইংয়ের (র) অনিল ধসমানের নেতৃত্বে এই প্রোগ্রামটি অনেক সাফল্য পেয়েছে। লস্কর-ই তৈয়্যবা ও জইশ-ই মোহাম্মদের মতো সংগঠনগুলোকে কঠিন আঘাত হানতে পেরেছে ভারত।

 
কিন্তু মৃত্যুদণ্ডের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটিই প্রমাণ করছে, এই গোপন যুদ্ধও ঝুঁকিমুক্ত নয়। বিবেচনা ও কাজে সামন্য ভুলই অনেক বড় ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। যে লক্ষ্য অর্জনে এই কাজ করা হয়, তার চেয়েও বড় ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।

 
নৌবাহিনীর চাকরিতে

যাদব এখনো ভারতীয় নৌবাহিনীতে চাকরি করছে এই দাবির সত্যতা প্রমাণে নীতিগতভাবে কোনো বাধা থাকার কথা নয়। ভারতের গেজেটে আরো অন্যান্য বিষয়ের মতো সামরিক ও সরকারি কর্মকর্তাদের কমিশন লাভ, পদোন্নতি ও অবসর গ্রহণের বিস্তারিত তথ্য সংরক্ষণ করা হয়। ১৯৮৭ সালে নৌবাহিনীতে যোগ দেয়া কূলভূষণ সুধির যাদব সম্ভবত ১৩ বছর পর ২০০০ সালে কমান্ডার পদে পদোন্নতি পেয়েছেন। নৌবাহিনীতে তার সার্ভিস নম্বর ৪১৫৫৮জেড।

 

 
কিন্তু ভারতীয় গেজেটের ডিজিটাল আর্কাইভ থেকে ২০০০ সালের কয়েকটি মাসের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত ফাইলগুলো সরিয়ে ফেলা হয়েছে। পরবর্তী কয়েক বছরের কোনো ফাইলে যাদবের অবসর গ্রহণের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। আর গেজেটে ভুলভ্রান্তি হওয়ার কোনো সম্ভাবনাও নেই।
এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতকে (আইসিজে) ভারত সরকার বলেছে, যাদব একজন অবসরপ্রাপ্ত নৌবাহিনী কর্মকর্তা। তবে তিনি ঠিক করে অবসর নিয়েছেন তা জানাতে অস্বীকার করেছে তারা। যদিও যাদবের চাকরির বিষয়টি তার গুপ্তচরবৃত্তির প্রশ্নে খুব বেশি প্রাসঙ্গিক নয়।

 

 
এই লেখকের লিখিত প্রশ্নের জবাবে ভারতীয় নৌবাহিনীর সদর দফতর যাদবের চাকরির বিষয়টি অস্বীকার কিংবা নিশ্চিত কোনোটিই করতে চায়নি। তারা এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে যোগাযোগ করতে বলে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইতোমধ্যেই যা জানানো হয়েছে তারপর নতুন করে কিছু বলার নেই তাদের।

 

 
সাধারণত গুপ্তচরবৃত্তির জন্য কেউ আটক হলে রাষ্ট্র সরাসরি তার সাথে সরকারের কোনো সম্পর্কের কথা অস্বীকার করে। এখন পর্যন্ত ১৩ জন ভারতীয় নাগরিক গুপ্তচর বৃত্তির দায়ে আটক হয়েছে পাকিস্তানে। আর একই অভিযোগে ভারতের কারাগারে রয়েছে ৩০ পাকিস্তানি নাগরিক। কিন্তু একটি ঘটনাতেও কোনো দেশ তাদের এজেন্টের পরিণতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেনি।

 

 

গোয়েন্দা জগতে পদার্পণ

যাদব এখনো নৌবাহিনীতে কর্মরত এই সম্ভাবনাটিই মামলাটির আলাদা গুরুত্ব তৈরি করে। ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশের সরকার নিশ্চিতভাবেই জানে প্রকৃত সত্যটি কী।

 

 
যাদবের সাথে কাজ করেছেন এমন দুই নৌ কর্মকর্তার মতে, গুপ্তচরবৃত্তির নিষিদ্ধ জগতের যাদবের যোগাযোগ হয়েছিল ২০০১ সালের ভারতীয় পার্লামেন্ট ভবনে জইশ-ই মোহাম্মদ গোষ্ঠীর হামলা পরবর্তী পাক-ভারত উত্তেজনার পর। পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী অবস্থায় দেয়া ভিডিও সাক্ষাৎকারে যাদব নিজেও এই দাবি করেছেন।

 

 
২০০১ সালের শেষ দিকে নৌবাহিনী গুজরাট ও মহারাষ্ট্রের উপকূলীয় এলাকায় নজরদারির জন্য ৯টি নৌ পয়েন্ট চালু করে। উপকূলীয় শহরগুলোতে উগ্রপন্থী সংগঠনগুলোর হামলার আশঙ্কায় এই পরিকল্পনা নেয়া হয়। ওই সময় বিভিন্ন দিক থেকে তথ্য আসতে থাকে যে, লস্কর-ই তেয়্যবা তাদের সদস্যদের নৌ বিদ্যায় পারদর্শী করার প্রশিক্ষণ দিচ্ছে আজাদ কাশ্মিরের মংলা বাধ এলাকায়। এই তথ্যগুলোকে গুরুত্বের সাথে নিয়ে বিষয়টিতে গভীর উদ্বেগ ছিল নৌবাহিনীর।

 

 
তবে শুরুতেই নৌবাহিনী বুঝতে পারে তাদের প্রধান সমস্যাটি : সমুদ্রপথে হামলা চালাতে পারে এমন সংগঠিত অপরাধীদের বিরুদ্ধে কাজ করার জন্য স্বতন্ত্র গোয়েন্দা সক্ষমতা নেই তাদের। যাদব স্বেচ্ছায় গোপন কাজে যুক্ত হতে রাজি হন বলে তার সহকর্মীরা বলেছেন। একটি অনুষ্ঠানে যাদবের সাথে দেখা হয়েছে এমন একজন সিনিয়র গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, ‘অল্প কয়েকজন এই বিপজ্জনক কাজ করতে রাজি হন। অতিরিক্ত সাহসের জন্যই তাকে বাছাই করা হয়েছিল।’

 

 
আরেক সিনিয়র নৌবাহিনী কর্মকর্তা বলেন, কিন্তু সেখানেও একটি সমস্যা ছিল। পদোন্নতি ও আর্থিক সুবিধার জন্যই কমান্ডার (যাদব) তার নৌবাহিনীর চাকরিতে থেকেই এই দায়িত্ব পালন করতে চেয়েছেন। কাগজপত্রে নাম না রেখে বিদেশে দায়িত্ব পালনের কোনো নিয়ম নৌবাহিনীতে ছিল না, সে কারণেই তার বিষয়টি এভাবে হয়েছে (বাহিনীর পদে থেকেই নতুন দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে)।

 

 

ইরান যাত্রা

২০০৩ সালে ডিসেম্বরে পুনে থেকে বি৬৯৩৪৭৬৬ নম্বরের পাসপোর্টে ইরান যায় যাদব। পাসপোর্টে তার নাম ছিল হুসেইন মোবারক প্যাটেল। পাসপোর্টে ঠিকানা ছিল পুনের মার্টল্যান্ড কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটি। তবে কোন ফ্ল্যাট নম্বর দেয়া ছিল না। এই পাসপোর্টটি কিভাবে ইস্যু করা হয়েছে সে ব্যাপারে কোনো সরকারি তদন্তও হয়নি।

 

 
পুনে পাসপোর্ট অফিসের রেকর্ডে দেখা গেছে, ওই পাসপোর্টটি আগে আরেকজন ব্যবহার করত, তবে তার কোনো ঠিকানা ফাইলে লেখা নেই। কিভাবে আরেকজনের পাসপোর্ট যাদব পেল সে ব্যাপারে ভারত সরকার কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি। কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে, যাদবের এই ‘কল্পকাহিনীর’ জন্য অর্থ দিয়েছে নৌ গোয়েন্দা দফতর। ইরানি কর্মকর্তাদের তদন্ত ও কূটনৈতিক সূত্রগুলো থেকেও এই দাবির সমর্থনে বক্তব্য পাওয়া গেছে। সেই অর্থ দিয়েই যাদব কামিন্দা ট্রেডিং কোম্পানি নামে একটি প্রতিষ্ঠান চালু করে। প্রতিষ্ঠানটির কাজ ছিলে নৌযান মেরামত করা। পরে এই প্রতিষ্ঠানটি চাবাহার বন্দরে একটি নৌযানও চালু করে। রেকর্ড থেকে জানা যায়, যাদবের কোম্পানি জিপসাম সাপ্লাইয়ের জন্য ঠিকাদারদের আহ্বান জানায়। সিমেন্ট তৈরির জন্য ভারত এই পদার্থটি আমদানি করে। ২০১৫ সালে মার্চে যাদব বার্ষিক চুক্তিতে সরবরাহের জন্য অংশীদার খুঁজতে থাকে বলেও জানা যায়।

 

 
পাকিস্তান যে স্বীকারোক্তিমূলক জবাববন্দি প্রকাশ করেছে সেখানে যাদব বলেছেন, তিনি ইরানের চাবাহারে একটি ছোট ব্যবসায় চালু করেছিলেন এবং ২০০৩ ও ’০৪ সালে নিজের অবস্থান গোপন রাখা ও গোপনে করাচি সফর করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

 
একজন সিনিয়র কূটনীতিক জানিয়েছেন, এ বিষয়ে তেহরানের নিজস্ব তদন্তে দেখা গেছে কামিন্দা নামক প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড ছিল খুবই কম। প্রশ্ন উঠছে, তাহলে কেন যাদব এত বছর ইরানে থেকেছেন। ওই কূটনীতিক আরো জানান, কামিন্দার কাছে কোথাও থেকে অর্থও আসেনি এ সময়, যা ব্যবসার একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।

 
যাদবের বাবার ঘনিষ্ঠ এক পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ভারতে যাদবের পরিবারও নিয়মিতভাবে কোনো অর্থ পায়নি তার কাছ থেকে। তারা সংবাদমাধ্যমের সাথে কথা বলতে রাজি হয়নি।

 

 

কাজের পরিধি বৃদ্ধি

২০০৮ সালের নভেম্বরের মুম্বাই হামলার আগে ব্যাপক সংখ্যক ভারতীয় উগ্রপন্থী ইরানের জাহেদান হয়ে পাকিস্তানের প্রশিক্ষণ শিবিরগুলোতে গেছে প্রশিক্ষণ নিতে। যাকে লস্কর-ই-তৈয়্যবার ভারতীয় শীর্ষ এজেন্ট মনে করা হয় সেই ফাহিম আরশাদ আনসারি, ফেরারি বোমা বিশেষজ্ঞ ফয়েজ কাগজী ছিলেন এই দলে। ২০০৬ সালের দিকে বালুচিস্তানের বিদ্রোহ ফুঁসে ওঠে। ভারতীয় গোয়েন্দা বাহিনী তাদের আফগান ঘাঁটিগুলো থেকে পর্যাপ্ত তথ্য পেলেও ওই অঞ্চলে কার্যক্রম আরো জোরদারের জন্য চাপ দেয়া হয় তাদের।

 
দুই কর্মকর্তা বলেছেন, নৌ গোয়েন্দা সংস্থাকে হতাশ করে চাবাহারে তাদের নতুন সম্পদটি ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর (আইবি) হয়ে সন্ত্রাস দমনে কাজ করতে শুরু করে। তাদের ভয় ছিল, যাদবের নৌবাহিনীর চাকরিতে থাকার বিষয়টি ঝামেলা তৈরি করতে পারে।

 

 
সূত্র জানিয়েছে, ২০০৪ থেকে ২০০৬ সাল সময়ে নৌবাহিনী প্রধানের দায়িত্ব পালন করা অ্যাডমিরাল অরুণ প্রকাশ এ বিষয়টির বিরোধিতা করলেও ওই অঞ্চলে থাকা এমন একটি আস্থা রাখার মতো লোককে কাজে লাগাতে গোয়েন্দা প্রধান ছিলেন বেপরোয়া। এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আইবি যাদবকে যে কাজ দিয়েছে তার ফলাফল সম্পর্কে সত্যিই উদ্বেগে ছিল নৌবাহিনী। তবে আমরা মূলত এটিই বলেছি, যেহেতু সে ওখানে আছে তাই তাকে কাজে লাগাতে দোষ কী।’

 

 
র-এর সাবেক কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, যাদবকে গোয়েন্দা কার্যক্রমের সম্মুখ সারিতে নিয়ে আসার পেছনে ছিল আইবির স্বতন্ত্র বৈদেশিক কার্যক্রমের উচ্চাভিলাষ। ওই অঞ্চলে র-এর নিজস্ব গোয়েন্দা কার্যক্রম ক্রমবর্ধমান হুমকি মোকাবেলায় যথেষ্ট ছিল। ওই সময়ে কর্মরত ছিলেন ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর এমন কর্মকর্তারা বলেছেন, তাদের উদ্যোগটি যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত ছিল। উদারহরণস্বরূপ ২০০৭ সালের মার্চে লস্কর সদস্য জামিল আহমেদ আওয়ান ও আবদুল মজিদ আরিয়ানের নেতৃত্বে ৮ পাকিস্তানি নাগরিক মুম্বাইতে আসে। মহারাষ্ট্র ও গুজরাটে তাদের হামলা করার লক্ষ্য ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। কিন্তু ওই পরিকল্পিত হামলাটি নস্যাৎ করে দেয় এবং সন্ত্রাসীদের আটক করে আইবি।

 

 
সূত্র জানায়, মুম্বাই হামলার (২৬/১১) পর যাদব তার ভূমিকা জোরদার করতে চান এবং একই ধরনের একটি সন্ত্রাসী হামলা হওয়া উচিত বলে জানান। এমনকি কামিন্দা প্রতিষ্ঠানটিকে ব্যবহার করে করাচিতে একটি প্রতিশোধমূলক হামলা চালানোরও পরিকল্পনা করেন। তার এই পরিকল্পনা গৃহীত না হলেও শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তারা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন যে, পাকিস্তানকে পরাজিত করতে আরো বেশি গুপ্তচরবৃত্তি নেয়া দরকার।

 

 
২০১০ সালে প্রথমবারের মতো সাবেক নৌ কর্মকর্তা পরিচয়ে র-এর সাথে যোগ দেন যাদব। তবে সেখানে তাকে স্বাগত জানানো হয়নি। গোয়েন্দা সংস্থাটির পাকিস্তানবিষয়ক ডেস্কের প্রধান আনন্দ আরনি যাদবের তার সংস্থা হয়ে কাজ করার প্রস্তাব বাতিল করে দেন। তার যুক্তি ছিল, নৌ কমান্ডারের বুদ্ধিমত্তা সামান্য। র-য়ের সাবেক এক কর্মকর্তা সেই সময়ের কথা স্মরণ করে বলেন, ‘চারটি মিটিংয়ে আমরা বলেছিলাম তার জন্য কিছু ছোটখাটো পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে। পরীক্ষায় সে আমাদের আগ্রহ সৃষ্টির মতো কিছুই দিতে পারেনি। তবে কেসি ভার্মা থেকে শুরু করে পরবর্তী র প্রধানরা যাদবকে কিছু অর্থ দিতেন। ওই লেনদেনের সাথে জড়িত এক কর্মকর্তা বলেছেন, ‘সম্ভাব্য সূত্রগুলোর সাথে সম্পর্ক রক্ষার জন্য এটি ছিল একটি রুটিন কাজ।’ মজার ব্যাপার হচ্ছে, বেশ কয়েকজন র প্রধানের সময় এই অর্থ প্রদান অব্যাহত ছিল। ভার্মার পর সঞ্চিব ত্রিপাথি (২০১০-১২), অলক জোশির (২০১২-১৪) যুগেও। তবে পুরো এই সময়ে কেউ যাদবের চাকরির বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করে দেখেননি। তার মানে এ সময় তিনি নৌবাহিনীর কর্মকর্তা হিসেবেও বহাল ছিলেন।

 
র-এর নিয়মিত কর্মীদের অনেকে সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তা থেকে এসেছেন। তবে তারা ছিলেন প্রেষণে এবং এই কর্মকর্তারা কখনোই সরাসরি অপারেশনের সাথে জড়িত ছিলেন না। অর্থাৎ প্রকাশ্য কাজগুলোতে সরকার ও এজেন্টদের তৎপরতার মধ্যে এটি কাজ করত দেয়াল হিসেবে।
অতিরঞ্জিত স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে যাদব জানিয়েছেন, তিনি ২০১৩ সালে অনিল কুমার গুপ্ত নামে এক কর্মকর্তার অধীনে র-এর হয়ে কাজ শুরু করেন। তবে সংস্থাটিতে এ নামে কোনো কর্মকর্তা ছিল না, বর্তমানেও নেই। পরবর্তী আরেক ভিডিওতে তিনি র প্রধান অলিন ধাসমান ও জোশির নাম বলেছেন। ভার্মা ও জোশি দু’জনই সাবেক আইবি অফিসার এবং সম্ভবত ২৬/১১ পূর্ববর্তী সময়ে যাদবের সাথে তারা কাজ করে থাকতে পারেন।

 
যাদব এল৯৬৩০৭২২ নম্বরের যে পাসপোর্টটি নিয়ে পাকিস্তানের হাতে আটক হয়েছেন সেটি ২০১৪ সালে তার হাতে আসে। মুম্বাইয়ের পার্শ্ববর্তী থানে শহরে সেটি ইস্যু করা হয়। সে সময় তিনি মুম্বাই-পুনে সড়কের জশোদাবালা কমপ্লেক্সের বাসিন্দা হিসেবে পরিচয় দেন। পৌরসভার রেকর্ডে দেখা গেছে, সেখানের ফ্ল্যাটির মালিক তার মা অবন্তি যাদব। পাসপোর্টে যথাযথ ঠিকানা ব্যবহার করা একটি বড় ধরনের ভুল, যদি তিনি সে সময় গোয়েন্দা সংস্থার সাথে কাজে জড়িত থাকেন। একজন র কর্মকর্তা বলেন, ‘যাদব তার পরিচয় সম্পর্কে যা বলেছে, তা অস্বীকার করা ভারতের পক্ষে অসম্ভব। একজন গুপ্তচরের ব্যবহৃত পরিচয় তার আসল পরিচয়ের কাছাকাছি হওয়াটাও বড় ধরনের একটি দায়িত্বজ্ঞানহীনতা ও অপরাধ।’

 

 

বিশ্বাসঘাতকতার পথে

সূত্র জানায়, ২০১৪ সালের পর থেকে যাদব করাচিভিত্তিক সন্ত্রাসী উজাইর বালুচের সাথে ঘনিষ্ঠ হতে থাকে। উজাইর একসময় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ঘনিষ্ঠ লোক থাকলেও ২০১৩ সালে সে দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। ১৯৮৭ সাল থেকেই উজাইরের রয়েছে ইরানি পাসপোর্ট, চাবাহারে স্থায়ীভাবে থাকত না সে, আসত আবার চলে যেত। তার ভাতিজা জালাল বালুচের পাশের বাড়িতেই থাকতেন যাদব, তথ্য সরবরাহের বিনিময়ে তাদের দিত অর্থ। পাকিস্তান সেনাবাহিনী জোর দিয়ে বলছে, ২০১৪ সালের পর থেকে র-এর পক্ষ থেকে অন্তত পাঁচটি অস্ত্রের চালান বালুচ বিদ্রোহীদের কাছে পৌঁছে দিয়েছে যাদব। যদিও বিষয়টি পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।

 

 
(পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা) আইএসআইয়ের সাথে সম্পর্ক খারাপ হওয়ার পর উজাইর বালুচকে আশ্রয় দিয়েছে ইরান। পাকিস্তানের একটি তদন্তের নথিতে দেখা গেছে, উজাইর গুপ্তচরবৃত্তিতে জড়িত হয়ে বিদেশী কর্মকর্তা ও এজেন্টদের কাছে গোপন তথ্য ও পাকিস্তানের সেনা স্থাপনার নকশা সরবরাহ করত। তবে তার সরবরাহ করা জিনিসগুলো ছিল নি¤œমানের।

 
গত বছর উজাইর বালুচ ইন্টারপোলের এক পরোয়ানার ভিত্তিতে আবুধাবিতে গ্রেফতার হয়, পরে তাকে পাকিস্তানের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, উজারইকে জিজ্ঞাসাবাদ করেই আইএসআই চাবাহারে কর্মরত অজ্ঞাত ভারতীয়দের বিষয়ে জানতে পারে। ২০১৭ সালের এপ্রিলে করাচির এক আদালতে সাক্ষ্য দেয় উজাইর, স্বীকার করে কূলভূষণ যাদব ও ইরানি গোয়েন্দাদের সাথে সম্পর্কের কথা। যাদবের মামলাটি কিভাবে শেষ হবে তা অনেকটাই ঠিক করে দেয় উজাইরের জবাববন্দি।

 
পাকিস্তানি মিডিয়ায় যাদবের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সম্পর্কে বলা হলেও সেনাবাহিনীর আদালতে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয় গোপনীয়তা আইনে। ওই আইন অনুসারে কোনো ব্যক্তি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষাভাবে শত্রুদের কাজে লাগতে পারে এমন কোনো তথ্য সরবরাহ করলে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার বিধান রয়েছে।

 

 
পাকিস্তানি সূত্রগুলো বলেছে, যাদবের গ্রেফতারের পর তাকে সন্ত্রাসী কার্যক্রমের সাথে যুক্ত থাকার দায়ে অভিযুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয় আইএসআইয়ে। উল্লেখ্য, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রকাশিত যাদবের প্রথম স্বীকারোক্তিমূলক ভিডিও সাক্ষ্যে ভারতের পক্ষ হয়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কথা বলা হলেও তাতে তিনি সরাসরি জড়িত কিনা সে বিষয়ে কোনো কথা নেই। পাকিস্তানের (তৎকালীন) প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক উপদেষ্টা সারতাজ আজিজ ২০১৭ সালের এপ্রিলে পার্লামেন্টে বলেছেন, সরকারের জন্য গোয়েন্দা বাহিনীর প্রস্তুতকৃত একটি ফাইলে ‘কোনো অকাট্য প্রমাণ ছিল না। এতে যেসব তথ্য রয়েছে তা যথেষ্ট নয়।’

 
কিন্তু আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতে পাকিস্তান যে গোপন নথি উপস্থাপন করেছে তাতে ১৩ জন সিনিয়র ভারতীয় কর্মকর্তার নাম রয়েছে, যারা যাদবের কাজে সহযোগিতা করেছেন। এর আগে ভারত সরকারকে দেয়া এক চিঠিতে পাকিস্তান ‘তদন্ত প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা চেয়েছে এবং দ্রুত বিচার করার কথা জানিয়েছে’।

 
সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের সূত্র জানিয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল ও সাবেক ও প্রধান অলোক জোশির নাম রয়েছে ওই দুটো ফাইলেই। মূলত যাদবের ঘটনা ও ভারতে সন্ত্রাসী হামলায় পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার জড়িত থাকাকে সমান্তরাল রাখার একটি চেষ্টা এটি। সাবেক একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেছেন, ‘ভারতীয় গুপ্তচরবৃত্তিকে মুম্বাই হামলার মতো ঘটনাগুলোর মতো করে দেখানোর চেষ্টা এটি। যদিও যাদবের চাকরির বিষয়টিই একমাত্র এ ঘটনাগুলোর গুরুত্ব তৈরি করে। সত্যিই সে যদি নৌবাহিনীর কর্মকর্তা হয়, তার অর্থ হচ্ছে আমাদের গুপ্তচরবৃত্তিতে অনেক সমস্যা রয়েছে, যেগুলো ঠিক করার দরকার।’

 

 
সামনে বিপদ

১৯৪৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র সরকার সিআইএ’র অভ্যন্তরে বিশেষ প্রকল্পগুলোর জন্য নতুন একটি অফিস খোলে। এই অফিসের কাজ ছিল বিশ্বব্যাপী গোপন অভিযান চালানো। তারা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা পর্ষদের নির্দেশনা অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী শত্রুদেশ কিংবা গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে সরাসরি অ্যাকশন কিংবা তাতে পৃষ্ঠপোষকতা করত এবং বন্ধু রাষ্ট্র বা সরকারকে সহযোগিতা করত। বাস্তবে এর কাজ ছিল ইতালির মতো কমিউনিস্টবিরোধী বাহিনীগুলোকে অর্থ সরবরাহ করা, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি হতে পারে এমন নেতাদের প্রয়োজনে খুন করা।

 

 
ওই নির্দেশনায় গুরুত্বপূর্ণ একটি বিধান ছিল গোপন অ্যাকশনগুলো হবে খুবই পরিকল্পিত ও এমনভাবে সাজানো যাতে এসব ঘটনার জন্য যুক্তরাষ্ট্র সরকারের দায়ের কোনো প্রমাণ কিছুতেই কোনো অননুমোদিত ব্যক্তির কাছে না থাকে এবং এ বিষয়ক কিছু প্রকাশিত হলেও যাতে সরকার বিশ্বাসযোগ্যভাবে তা অস্বীকার করতে পারে।

 

 
যাদব নৌবাহিনীর কর্মকর্তা পদে আছেন কিংবা নেই, সেটি নিয়ে কোনো প্রমাণই এখনো স্পষ্ট নয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত যেসব প্রশ্ন উঠেছে সেগুলোই ভারতকে বিপাকে ফেলার জন্য যথেষ্ট। যেকোনো গুপ্তচরবৃত্তির পরিকল্পনার ভিত্তি অবশ্যই এমন হওয়া উচিত যে, চাইলে সেটি যাতে অস্বীকার করা যায়।
ভারতের ক্রমবর্ধমান গুপ্তচরবৃত্তি ও এর দীর্ঘ মেয়াদি উদ্দেশ্যের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে ভাবার জন্য এটি একটি উপলক্ষ হতে পারে। দুঃখজনকভাবে গুপ্তচরবৃত্তির পক্ষ ও বিপক্ষ উভয় দলের জন্য এটি উদ্বেগজনক একটি পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। বিষয়টি নিয়ে ভারতে রাজনৈতিক বিতর্কও হবে। অথচ যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ইসরাইল ও রাশিয়ার মতো দেশগুলো তাদের গোপন অ্যাকশন কর্মসূচি গড়ে তুলেছে প্রধানত রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতেই।

 

 
এখন যেটি প্রকাশ হয়ে পড়েছে, অতীতেও ভারত এমন গোপন অ্যাকশন কর্মসূচি নিয়েছে। মেজর জেনারেল সুরজিত সিং উবানের অধীনে ‘স্টাবলিসমেন্ট ২২’ নামে খ্যাত (স্পেশাল ফ্রন্টিয়ার ফোর্স) বাহিনীটি গোপন যুদ্ধ চালায় এখনকার বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান)। এই গ্রুপটিই সিকিমের একীভূতকরণের লক্ষ্যে কাজ করেছে, তামিল সন্ত্রাসীদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে এবং মিয়ানমারের চীনপন্থী সরকারের বিরুদ্ধে সহযোগিতা করেছে সশস্ত্র বিদ্রোহীদের। ১৯৮০ এর দশকে র দু’টি গোপন অ্যাকশন গ্রুপ তৈরি করে। কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স টিম-এক্স ও কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স টিম-জে নামের গ্রুপ দুটির টার্গেট ছিল আইএসআইয়ের সহায়তাপুষ্ট খালিস্তানি গ্রুপ (দমন করা)। ভারতীয় শহরগুলোতে প্রতিটি খালিস্তানি হামলার প্রতিশোধ নিতে লাহোর ও করাচিতে হামলা চালানো হতো। ২০০২ সালে এক লেখায় সাবেক র কর্মকর্তা বি. রমন লিখেছেন, ‘পাঞ্জাবে আইএসআইয়ের হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে আমাদের গোপন অ্যাকশন কর্মসূচি চলেছে।’

 

 
প্রধানমন্ত্রী আই কে গুজরাল পাকিস্তানের বিরুদ্ধে র-এর আক্রমণাত্মক কর্মসূচি বন্ধ করেন এবং তার পূর্বসূরি প্রধানমন্ত্রী পিভি নরসীমা রাও এই সংস্থার পূর্বাঞ্চলীয় কার্যক্রম গুটিয়ে নেন। তবে ২০০৮ সালের মুম্বাই হামলার পর সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এমকে নারায়ণনসহ অনেক সিনিয়র গোয়েন্দা কর্মকর্তা আইএসআইয়ের বিরুদ্ধে র-এর গোপন অ্যাকশন বৃদ্ধির দাবি জানান। পাকিস্তানের উগ্রপন্থী গ্রুপগুলোর বিরুদ্ধে র-এর অভূতপূর্ব সাফল্য গোয়েন্দা জগতে বেশ প্রশংসিত। ২০১৩ সালে লস্কর প্রধান হাফিজ সাইদের নিরাপত্তা প্রধান খালিদ বাশারকে হত্যা, সীমান্তের ওপার থেকে এসে জইশ-ই মোহাম্মদের হামলার পরিকল্পনা ভণ্ডুল করা, কাশ্মিরে পাকিস্তানি সহায়তার পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে বালুচ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অস্ত্র দেয়ার ঘটনাগুলোর জন্য পাকিস্তান দায়ী করত র-এর নতুন নেতৃত্বকে।

 

 
সাধারণত আইনি প্রক্রিয়ায় কিংবা প্রকাশ্যে করা সম্ভব নয় এমন কাজে প্রায় সব রাষ্ট্রই গুপ্তচরবৃত্তির ওপর নির্ভর করে। এ ধরনের অপারেশনে ক্ষমতার সতর্ক ব্যবহার হয়, এগুলো যুদ্ধের ঝুঁকি কমায় এবং সরকারের ওপর জনগণের চাপ কমাতে সহায়তা করে।

 

 
তবে গুপ্তচরবৃত্তি খারাপ ফলাফলও বয়ে আনতে পারে। নিকারাগুয়ার কন্ট্রা বিদ্রোহীদের সমর্থন দিত যুক্তরাষ্ট্র, যারা তাদের দেশেই মাদক সরবরাহকারীদের সহযোগিতা করত। আফগানিস্তানে সোভিয়েতবিরোধী গোষ্ঠীকে অস্ত্র দিয়েছে, যারাই জন্ম দিয়েছে নাইন ইলেভেনের। এই গুপ্তচরবৃত্তি বিশ্বব্যাপী সরকারগুলোকে অস্থিতিশীল করতে ব্যবহৃত হয়, যা বিশ্বব্যাপস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং ভয়াবহ ফলাফল ডেকে আনে।

 

 

যে প্রশ্নের জবাব নেই

অতঃপর কূলভূষণ যাদবের ঘটনাটি এই প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে যে, সম্ভাব্য ঝুঁকি থেকে ভারতকে রক্ষা করতে যে ধরনের মনোযোগ দরকার তা ভারতের গোয়েন্দা কর্তারা দিতে পারছেন কিনা। যাদবের পাসপোর্ট নিয়ে প্রশ্ন, তার ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড নিয়ে অস্বচ্ছতা, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি ভারতীয় নৌবাহিনীর সাথে তার সংযোগের বিষয়টি নিয়ে ধোঁয়াশা এই বিষয়গুলোর কারণে ভারত সরকারের জন্য কঠিন হবে এই কেলেঙ্কারি থেকে নিজেদের বাঁচানো। এগুলো যাবদকেও টেনে নিয়ে যাবে গুপ্তচরদের নিয়তির দিকে। আরেকটি বিষয় এখনো স্পষ্ট নয়, সেটি হলো যাদব যদি গুপ্তচর হয়েই থাকেন তাহলে উজাইর বালুচের গ্রেফতারের পর কেন তাকে ফিরিয়ে আনা হলো না। আরো গুরুত্বপূর্ণ হলো, গুপ্তচরবৃত্তির সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে দলগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক বিতর্ক হওয়া দরকার। এ ঘটনায় পাকিস্তানি বিচারকরা যাদবকে সহিংসতাদের সাথে সরাসরি জড়িত করার উপাদান কমই পাবে; কিন্তু এ ধরনের সমস্যা দূর করা না হলে তা ভবিষ্যতে বড় ধরনের ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। ভবিষ্যতে মুম্বাই হামলার মতো ঘটনা ঘটলে সে ক্ষেত্রে বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া হবে ভিন্ন, কারণ তখন বলা হবে ভারতও একই ধরনের সন্ত্রাসবাদের সাথে জড়িত।

 

 
যাদবের ঘটনার বিষয়ে যতটুকু সত্য জানা যাচ্ছে, তা তার পরিণতি পাল্টাতে খুব বেশি কাজে আসবে না। গত বছর মে মাসের ১৮ তারিখে পাকিস্তানকে যাদবের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে আর অগ্রসর হতে নিষেধ করে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালত। যদিও তারা বলেছে, গুপ্তচরবৃত্তি বা সন্ত্রাসবাদে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে রক্ষা করার অধিকার রাখে না ভিয়েনা কনভেনশন।

 

 
সাধারণভাবে দেখলে যাদব ভারতীয় আইনের অধীনে ভারত সরকারকে সহযোগিতা করেছে, তা সে ইরান অথবা পাকিস্তানে যাই করুক না কেন। আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালত অপরাধমূলক মামলার বিচার করে না। কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ আইনের ওপরও প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। তারা যাদবের বিষয়ে পাকিস্তানকে আবারো অনুরোধ করবে এবং সে সময় তিনি যাতে ইসলামাবাদের ভারতীয় দূতাবাসের সহযোগিতা পায় সেটিও নিশ্চিত করা হবে। পাকিস্তানি কৌঁসুলিরা উপস্থাপনের আগে একটি স্থানীয় আদালত প্রমাণগুলো যাচাই করে দেখবে। আর এই প্রমাণগুলোর মধ্যে অবশই থাকবে যে নৌবাহিনীতে চাকরি অবস্থায় যাদবের গুপ্তচর হিসেবে কাজ করার কথা। তার নিজের জবানবন্দিতেও রয়েছে এমন বক্তব্য।
ইতিহাসে এ ধরনের কিছু ঘটনার নজির আছে। ১৯৬০ সালে সিআইএ’র গোয়েন্দা বিমান ভূপাতিত করে সোভিয়েত ইউনিয়ন। পাইলট গ্রে পাওয়ার্সকে বন্দী করার পর তার বিনিময়ে মস্কো ছাড়িয়ে নেয় কিংবদন্তি কেজিবি গোয়েন্দা ভিলিয়াম জেনরিখোবিচ ফিশারকে। ধরা পড়ার আগে গ্রে কেন আত্মহত্যা করেনি সেটি নিয়ে অনেকেই তাকে ভর্ৎসনা করেছে। গুজব আছে যে, নয়াদিল্লি ও ইসলামাবাদ এ ধরনের একটি চুক্তি নিয়ে কাজ করছে। সম্ভবত এই চুক্তিতে থাকতে পারে সাবেক আইএসআই অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ জহির হাবিব, যাকে ভারত অপহরণ করেছে বলে অভিযোগ আছে। অথবা আরো বড় কোনো চুক্তি হতে পারে যাতে একাধিক গুপ্তচরকে ছাড়িয়ে নিতে চাইতে পারে পাকিস্তান।

 

 
এই বিষয়ে আলোচনার মাধ্যমে উভয় দেশেরই লাভবান হওয়ার সুযোগ আছে, বিশেষ করে যখন পরস্পরের ওপর চলে গুপ্তচরবৃত্তি। সে জন্য কূলভূষণ যাদবের বিষয়টি সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া এবং যুক্তিযুক্ত আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।

 

 

হুবহু অনুবাদ করেছেন আহমেদ বায়েজীদ। সৌজন্যে: অন্য এক দিগন্ত

Facebook Comments

এ সংক্রান্ত আরো খবর




সম্পাদক: আরিফা রহমান

২৮/এফ ট্রয়োনবী সার্কুলার রোড, ৫ম তলা, মতিঝিল, ঢাকা।
সর্বক্ষণিক যোগাযোগ: ০১৭১১-০২৪২৩৩
ই-মেইল ॥ sangbad24.net@gmail.com
© 2016 allrights reserved to Sangbad24.Net | Desing & Development BY Popular-IT.Com, Server Manneged BY PopularServer.Com