ads

আড্ডার গল্প – শামসুর রাহমান

শামসুর রাহমান

কাজী জহিরুল ইসলাম

 

 

১৯৮৫ সাল। তখন আমি তিতুমীর কলেজের ছাত্র। এক বিকেলে কবি আমিনুল হক আনওয়ার আমাকে বলেন, এ বছর শামসুর রাহমানের নতুন কি বই বের হয়েছে জানো? আমি বলি, জানি না। তুমি কেমন কবি বল তো, দেশের প্রধান কবির কি বই বের হয় তার খবর রাখো না। যাও, বইমেলায় গিয়ে শামসুর রাহমানের নতুন কাব্যগ্রন্থ ‘অস্ত্রে আমার বিশ্বাস নেই’ কিনে নিয়ে আসো। বইটা আমারও পড়া দরকার কিন্তু হাত একদম খালি। বই কেনার পয়সা নাই।

 
আমার কলেজে আসা যাওয়া করতে ষাট পয়সা ভাড়া লাগে, প্রতিদিন হাত খরচের বাজেট ২/৩ টাকা। দেড়’শ টাকার একটি টিউশনি করি, এ-ই আমার আয়ের উৎস। আব্বার অর্থনৈতিক অবস্থা বেশ খারাপ, আব্বার কাছে কোনো টাকা পয়সা চাই না। টাকা বাঁচিয়ে বই কেনা তখন আমার জন্য বিলাসিতাই। বইটই যা পড়ি তা এর-ওর কাছ থেকে ধার নিয়ে। কিন্তু আমিনুল হক আনওয়ার এমন ভাবে বললেন, তার কথা ফেলতে পারলাম না। আমার মাথায় তাঁর ভর্ৎসনাটিই ঘুরপাক খাচ্ছে। সত্যিই তো, আমি কেমন কবি, দেশের প্রধান কবির লেখালেখির খবর রাখি না।

 
তাঁর বাসা থেকে বেরিয়ে সোজা গুলশান এক নম্বর গোল চক্করে চলে যাই। ছয় নম্বর বাসে চড়ে ফার্মগেইট। সেখান থেকে আরো একটি বাসে চড়ে শাহবাগ এবং তারপর পায়ে হেঁটে বাংলা একাডেমী, একুশের বইমেলা। তখন এতো বইয়ের দোকান ছিল না। কয়েক সারি বইয়ের দোকান, ফাঁকা ফাঁকা লোকজন, বেশ আয়েশী ভঙ্গিতে হাঁটাহাঁটি করছে। আমি এ-দোকান সে-দোকান খুঁজে বইটি পাই। ৩৫ টাকা দিয়ে ‘অস্ত্রে আমার বিশ্বাস নেই’ কিনে সোজা বাসায় চলে আসি। বাসায় এসেই পড়তে বসি। প্রতিটি কবিতা বারবার পড়ি। যতদূর মনে পড়ে বইয়ের প্রথম কবিতাটির নাম ছিল ‘গুড মর্নিং বাংলাদেশ’, সেই কবিতার দুটি লাইন ছিল, ‘তুমি কি জেল্লাদের হ্যাট-কোট পরা শাঁসালো বিদেশিকে দেখে/ তোমার উরুদ্বয় ফাঁক করে দেবে নিমেষে?’ খুব অশ্লীল মনে হয়েছিল লাইন দুটি। এখন অবশ্য তা মনে হয় না। সত্যি কথা বলতে কি শামসুর রাহমানের এই গ্রন্থের কবিতাগুলো আমার তেমন ভালো লাগেনি।

 
পরদিন বইটি আমিনুল হক আনওয়ারের কাছে নিয়ে আসি এবং শামসুর রাহমানের কবিতা সম্পর্কে আমার অভিমত জানাই। তিনিও হয়ত ভেতরে ভেতরে আমার সাথে একমত পোষণ করেন কিন্তু একজন তরুণ কবিকে এ কথা বলার সুযোগ দিতে চান না। তাই আমাকে বলেন, তুমি বুঝতে পারোনি, আরো ভালো করে পড়তে হবে। পরবর্তি বেশ কয়েকদিন আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল শামসুর রাহমানের কবিতা। তাঁর নির্দেশে আমি শামসুর রাহমানের ‘বন্দি শিবির থেকে’ এবং ‘প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’ সংগ্রহ করে পড়ি এবং ক্রমশ শামসুর রাহমানের কবিতার প্রতি আগ্রহী হই।

 
কনকের ফুপা চৌধুরী রিয়াজউদ্দিন ছিলেন নবীনগর এলাকার কনিকারা পরগণার জমিদার। তাঁর নামে আমরা একটি পুরস্কার প্রবর্তন করি। এগুলো আসলে কনকের আইডিয়া। সাথে কনকের ফুপাত ভাই হান্নান চৌধুরী এবং মান্নান চৌধুরী (তিনি তখন কনিকাড়ার চেয়ারম্যান) যোগ দিয়েছেন। সেই পদক দেওয়া হবে শামসুর রাহমানকে। আমি আগ্রহী হই এজন্য যে এই সুবাদে শামসুর রাহমানকে দেখতে পাবো, তাঁর সঙ্গে কথা বলতে পারবো। সেই অনুষ্ঠানেই আমি প্রথম কবি শামসুর রাহমানকে দেখি।

 
এরপর আমি নিজেও যখন পুরোপুরি কবিতার মানুষ হয়ে উঠি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁর সঙ্গে বহুবার দেখা হয়েছে। একদিন শ্যামলী সিনেমা হল থেকে বেরিয়েছি, আমার এক বন্ধু মিনার জামান বলে, দোস্ত চলো শামসুর রাহমানের বাসায় যাই। আসলে তখনকার দিনে বিষয়গুলো এমনই ছিল। কারো বাসায় যেতে পূর্বানুমতি লাগত না। খবর দিয়ে যেতে হত না। পাশ দিয়ে যাচ্ছি, একটু ঢুঁ মেরে যাই, দেখা করে যাই, এমনই ছিল। আমরা শামসুর রাহমানের বাসায় ঢুকে পড়ি। বেশ সাদামাটা একটি ড্রয়িং রুম। আমরা বসে আছি। তিনি ভেতর থেকে আসেন। তাঁকে দেখে মনে হয় একজন দেবতা আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। আমি টুক করে দেবতাকে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করি। তিনি আমাদের মতো দুজন তরুণকে বলছেন, ‘আপনারা বসুন’। তাঁর সঙ্গে গল্প করার মতো প্রজ্ঞা আমাদের ছিল না। আমরা হালকা ধরণের কথা বার্তা বলি। আমি অবশ্য তাঁর বেশ কিছু কবিতা থেকে কিছু পঙক্তির উদ্ধৃতি দিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে পেরেছিলাম। অন্য অনেক কবির সঙ্গে আমার সখ্য হয়েছে, দেখেছি, আমি যখন তাঁদের কবিতার লাইন পড়ে শোনাই, তাঁরা আনন্দে আপ্লুত হন। শামসুর রাহমানও হয়ত হয়েছিলেন কিন্তু তা অন্য কবিদের মত তেমন করে চোখে পড়েনি।

 
এরপর ১৯৯৯ সালের ফেব্রুয়ারি/মার্চ মাসে আবারো একবার কবির শ্যমলীর বাড়িতে যাই। সেবার আমার সাথে ছিলেন বগুড়ার ফিরোজ আহমদ। কাজীর কাগজের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে তাঁকে দাওয়াত করতে গিয়েছিলাম। তখন আমি বেশ পরিণত। বাংলা কবিতার গতি প্রকৃতি, ভালো কবিতা মন্দ কবিতা, ইত্যাদি সম্পর্কে ধারণা বেশ টনটনে। সেদিনও কিন্তু আমরা খবর দিয়ে যাইনি। হঠাৎ চলে গেছি। এর কয়েকদিন আগেই রামপুরার এক তরুণ তাঁকে এই বাড়িতেই চাপাতি নিয়ে আক্রমণ করে। খবরটি ব্যাপক মিডিয়া কভারেজ পেয়েছে। আমি কিছুটা শঙ্কিত ছিলাম, এই সময়ে বিনা নোটিশে চলে গেলে দেখা করতে পারবো কিনা। বাসায় সিকিউরিটির ‘স’ -ও নেই। আমরা সোজা বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেলাম। কেউ একজন দরোজা খুলে দিল। আমরা ড্রয়িং রুমে গিয়ে বসলাম। শামসুর রাহমান পাঁচ মিনিটের মধ্যেই চলে এলেন। সেদিন অনেকক্ষণ আড্ডা দিই। তিনি সেই তরুণের কথাও তোলেন। মৌলবাদীরা ক্রমশ সক্রিয় হয়ে উঠছে এই আক্ষেপ করেন। আমি তাঁকে জানাই যে এর আগেও আমি এসেছিলাম, তিনি অবশ্য তা মনে করতে পারেননি। যদিও তিনি এমন ভাব দেখিয়েছেন যে আমাকে চেনেন, অন্তত আমার নাম জানেন, কিন্তু আমি বুঝতে পেরেছি তিনি আমার নামও জানেন না। তবে এ-দিনের এই বৈঠকের পর থেকে তিনি আমাকে চিনতেন।

 
১৩ই মার্চ ১৯৯৯ বেশ ঘটা করে কাজীর কাগজ-এর মোড়ক উন্মোচন হয় বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে। ফিরোজ আহমদ গিয়ে শামসুর রাহমানকে নিয়ে আসেন। তিনি অনুষ্ঠানের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ছিলেন। লেখক/কবিদের নিয়ে গবেষণামূলক পত্রিকা কাজীর কাগজ প্রকাশ করায় আমাকে সাধুবাদ জানান। এই ঘটনাটি দেশের সব মিডিয়াতেই প্রচার হয়। তখন থেকে শামসুর রাহমানের সাথে আমার একটি সখ্য গড়ে উঠতে থাকে। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই কবি কায়সুল হক এই সম্পর্কটি, জানি না কেন, ভেঙে দিতে তৎপর হন। একদিন আনওয়ার আহমদ আমাকে ফোন করে বলেন, শামসুর রাহমান চাচ্ছেন না তুমি তাঁর সাথে যোগাযোগ রাখো। আমি বলি কারণ কি? এবং আপনি কিভাবে জানলেন? তিনি বলেন, কায়সুল হক আমাকে বলেছে। ফজল শাহাবুদ্দীন নাকি বলেছেন, জহির তো আমার ভাই, আমার সাথে কথা বলতে শামসুর রাহমানের অসুবিধা কিন্তু জহিরের সাথে তো মাখামাখি। তাই কায়সুল হকের মাধ্যমে খবর পাঠিয়েছেন, তুমি যেন আর তাঁর সাথে মাখামাখি না কর। এই ঘটনার সত্য মিথ্যা আমি জানি না। তবে এরপর আমি আর শামসুর রাহমানের বাসায় যাই নি। অবশ্য এর অল্প কিছুদিন পরেই, ২০০০ সালের এপ্রিল মাসে, আমি বিদেশে চলে যাই। দেশে থাকলে এই সমস্যার সমাধান হয়ে যেত। কায়সুল হক যখন শৈলী পত্রিকার সম্পাদক তখন কিন্তু আমি শৈলীতে লিখেছি। তাই আনওয়ার ভাইয়ের এই তথ্যটি কতটা সত্য তা আমার কাছে আজও রহস্যই রয়ে গেল। আমি একদিন কবি শহীদ কাদরীকে এই ঘটনাটি বলেছিলাম। শহীদ ভাই অবশ্য সাথে সাথেই বলেন, হতে পারে, কারণ কায়সুল হক লোক বেশি সুবিধার না। সে একবার আমারও ক্ষতি করেছিল।

 

 

একদিন আল মাহমুদ আমাদের নিকেতনের বাসায়, ডিভাইনে বসে, মিটমিট করে হাসছেন। আমি বলি, হাসছেন কেন?

 
আমার একটা ইচ্ছা আছে, তুমি পূরণ করবা?
কি ইচ্ছা?
আমি চাই তুমি একদিন শামসুর রাহমানকে এখানে নিয়ে আসো। তুমি, আমি আর শামসুর রাহমান, আর কেউ থাকবে না।
তারপর?
তোমরা দুইজন বসে বসে রেড ওয়াইন খাবে আর আমি দেখবো।
আপনি খাবেন না?
ধুর, আমি এসব খাই নাকি?

 
মাহমুদ ভাইয়ের সেই ইচ্ছা আর পূরণ হয়নি। আমি ২০০৪-এর নভেম্বরেই আবার বিদেশে চলে যাই। ২০০৬-এর ১৭ আগস্ট শামসুর রাহমান যখন মারা যান, আমি তখন আইভরিকোষ্টের আবিদজান শহরে। খবরটি শোনার সাথে সাথে আমার চোখ থেকে হর হর করে শোকাশ্রু বেরিয়ে আসে। আমি তাঁকে নিয়ে এর কয়েকদিন পরেই একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখি। প্রবন্ধের শিরোনাম, ‘কবিতাই ছিল তাঁর চৈতন্যের ঘরবাড়ি।’

 
হলিসউড, নিউ ইয়র্ক। ২০ মার্চ ২০১৮।

Facebook Comments

এ সংক্রান্ত আরো খবর




সম্পাদক: আরিফা রহমান

২৮/এফ ট্রয়োনবী সার্কুলার রোড, ৫ম তলা, মতিঝিল, ঢাকা।
সর্বক্ষণিক যোগাযোগ: ০১৭১১-০২৪২৩৩
ই-মেইল ॥ sangbad24.net@gmail.com
© 2016 allrights reserved to Sangbad24.Net | Desing & Development BY Popular-IT.Com, Server Manneged BY PopularServer.Com