ads

উৎপলকে ফিরিয়ে দিন

লীনা পারভীন

লীনা পারভীন

 

 

উৎপল দাস। বয়স ২৯। পেশায় সাংবাদিক। অনলাইন নিউজ পোর্টাল পূর্বপশ্চিমবিডি ডট নিউজের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক হিসাবে কাজ করতেন। খুব সাধারণ ঘরের সন্তান এই উৎপল। বাবা পেশায় একজন শিক্ষক। এই অতি সাধারণ শিক্ষক পিতার সন্তান উৎপল জীবনে প্রতিষ্ঠা পাবার বাসনা নিয়ে এসেছিলো এই ঢাকা শহরে। তার বন্ধুদের বর্ণনায় জানা যায় সে ছিলো অত্যন্ত প্রানোচ্ছল একজন মানুষ। সারাক্ষণ হৈ হুল্লোড় আর আমোদ করে সময় কাটাতো। গত ১০ অক্টোবর মতিঝিলের অফিস থেকে বের হবার পর থেকে উৎপলকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

 

‘আমি অতি সাধারণ মানুষ। শিক্ষকতা করে জীবন চালিয়েছি। আমাদের কোনো শত্রু নেই। রাষ্ট্র ও সমাজের নানা জটিলতা আমরা বুঝি না। আমরা আমাদের সন্তানকে অক্ষত অবস্থায় ফিরে পেতে চাই।’ কথাগুলো সেদিনের সংবাদ সম্মেলনে বলেছে উৎপলের শিক্ষক পিতা। পড়ছিলাম আর ভাবছিলাম তবে কী আমাদের মত যারা এই সাধারণ পিতামাতার সন্তান আছে তাদের জীবনের কোন মূল্য নেই এই রাষ্ট্রের কাছে? কেন আজকে উৎপলের পরিবারকে এমন করে কান্নায় বুক ভাসাতে হচ্ছে?

 

 

গুম, খুনের অনেক রকম কাহিনি শোনা যায়। সেসবের একেকটার একেক কারণ ব্যাখ্যা করা হয় জনগনের সামনে। কেবল কারণ ব্যাখ্যা করাটাই কী সমাধান? উৎপলের পরিবারের বর্ণনা এবং তার কাছের পরিচিতদের মুখে শুনে বোঝা গেছে সে একজন নিপাট ভদ্র ছেলে ছিলো যার কোন প্রকার বাজে অভ্যাস ছিলো না বা বাজে সংশ্রবেরও কোন খবর পাওয়া যায়নি।

 

 

খুব বড় একটি প্রশ্ন জাগে, উৎপল তাহলে গেলো কোথায়? কোন রকম কথা বার্তা ছাড়া, কোন ক্লু ছাড়াই হঠাৎ করে একটি তাগড়া জোয়ান ছেলে এমন হাওয়া হয়ে গেলো? আইন শৃঙ্ক্ষলা বাহিনীর খুব একটা নড়াচড়া দেখা যাচ্ছে না এই বিষয়ে। প্রতিবাদ হচ্ছে উৎপলের কর্মস্থল থেকে, রাস্তায় নেমেছে তার কিছু সতীর্থ।

 

 
মাঝে আবার একদিন পত্রিকার পাতায় দেখলাম উৎপলের মোবাইল ফোন সচল এবং তার পরিবারের কাছে মুক্তিপণ চাওয়া হয়েছে যদিও পরবর্তীতে এর কোন খবর পাওয়া যায়নি। আসলে হচ্ছেটা কী? আমরা নাগরিক হিসাবে কী আতংকিত না হবার মত কোন কারণ আছে?

 

 

প্রতিনিয়ত খারাপ খবরের মাঝ দিয়ে যাচ্ছি আমরা এই বাংলাদেশের নাগরিকেরা। শত শত জঞ্জাল আমাদের নাগরিক জীবনকে জর্জরিত করে ফেলছে। নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দামের উর্ধগতি, চালের দাম হাতের নাগালের বাইরে চলে যাওয়া, কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি না হওয়ার মত হাজারো সমস্যা আমাদের জীবনকে নাকাল করে রেখেছে।

 

 

মনুষ্য সৃষ্ট দুর্যোগের পাশাপাশি রয়েছে প্রাকৃতিক দূর্যোগের আঘাত। বন্যার ছোবল এবার নিঃস্ব করে দিয়েছে এমন শত শত পরিবারকে। শহুরে জীবনে প্রতিনিয়ত রাস্তায় যানজট, জলজট আমাদেরকে করে তুলেছে অতিষ্ট।

 

 

রাস্তায় চলতে গেলে স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য নাই কোন বিশেষ পরিবহনের সুবিধা। দুবেলা দুমুঠো অন্নের সংস্থানের জন্য লড়াই করে টিকে আছে লাখো পরিবার। তারপরও টিকে আছি আমরা। হাঁটছি, খেলছি, চলছি সুস্থ মানুষের মত বেঁচে থাকার অভিনয় করে যাচ্ছি।

 

 

রাজনৈতিক অস্থিরতার এই দেশে ২০১৫ সাল পর্যন্ত হরতাল, অবরোধ, ধর্মঘটের নামে নাকাল করা হয়েছিলো মানুষের দৈনন্দিন জীবনের চাকাকে। পুড়ে মরেছিলো অতি সাধারণ মানুষজন। ধ্বংস করা হয়েছিলো দেশের সম্পদকে।

 

 

প্রশ্ন আসতে পারে, উৎপলের হারিয়ে যাওয়ার সাথে এসব গল্পের সম্পর্ক কোথায়? সম্পর্ক আছে। সম্পর্ক এখানেই যে এতসব অত্যাচার নিপীড়নের মাঝেও এদেশের মানুষ এই দেশের মায়া ত্যাগ করতে পারছে না। খেয়ে না খেয়ে আমরা নাগরিকেরা চাই কেবল ভালো থাকুক আমার দেশ। ভালো থাকুক এই দেশের মানুষ। তিনবেলার জায়গায় দুবেলা খেয়ে হলেও মেনে নিয়েছি এই দেশকে।

 

 

কিন্তু এতকিছুর পরও যদি জীবনের নিশ্চয়তাটাই না থাকে তবে আর কী নিয়ে বাঁচি আমরা? অত্যাচারের বিচার যদি না পাই তবে এই জীবনের মূল্য খুঁজে পাই না। আজকে উৎপল হারিয়ে গেছে, কাল হয়তো আমার ভাগ্যেও ঘটতে পারে এই পরিণতি। কিন্তু আমরা কী এমন উৎকন্ঠার জীবন চেয়েছি? ৩০ লাখ মানুষ কী এই ভয় আর শংকার জন্য দেশকে স্বাধীন করতে গিয়ে জীবন দিয়েছিলেন? তারা কী ভেবেছিলেন তাদের রেখে যাওয়া দেশে তাদেরই সন্তানেরা একদিন নিঁখোজ হয়ে যাবে কিন্তু তাকে খুঁজে দেবার দায় বোধ করবে না কেউ?

 

 

আমাদের আইন শৃঙ্ক্ষলা বাহিনীর অনেক ক্ষমতা আছে সে প্রমাণ আমরা পেয়েছি অনেক ঘটনায়। অনেক হারিয়ে মানুষকেও তারা আন্তরিকতা নিয়ে খুঁজে অতি অল্প সময়ের মাঝে ফিরিয়ে দিয়েছে তাদের পরিবারের কাছে। দেশকে জঙ্গী হামলার অনেক বড় রকম আশংকার হাত থেকে বাঁচিয়েছে তাদের বিচক্ষণ বাহিনী।

 

 

কিন্তু সেই বাহিনী আজকে কেন চুপ আছে উৎপলের বিষয়ে? উৎপল একজন সাধারণ শিক্ষকের ছেলে বলে? তার বাবার বড় কোন সামাজিক পরিচিত নেই বলে? উৎপলদের হারিয়ে যাওয়ায় রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রশ্নের সম্মুখীন হবার খুব একটা ভয় নেই বলেই কী মনে করছেন তারা?

 

 

কোন সভ্য রাষ্ট্রে কী এমনটা হতে পারে? জনগণের টাকায় চলা বাহিনীর প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তাকে নিশ্চিত করা। কিন্তু আমাদের রাষ্ট্রে বর্তমানে এই জায়গাটি সবচেয়ে দুর্বল।

 

 

উৎপলের পরিবার, তার বাবা মায়ের কথা একটিবার ভাবুন আপনারা। ছেলেটি বেঁচে আছে কী নেই সেটাও জানতে পারছে না তারা। আপনজনের হারিয়ে যাওয়া কতটা কষ্টের সে কথা হয়তো যারা হারায়নি তারা অনুভব করতে পারবে না। মৃত্যুর খবরেও কিছু পাওয়া যায় কিন্ত নিঁখোজ মানুষের জন্য প্রতীক্ষা ছাড়া আর কিছুই থাকে না।

 

 

প্রতীক্ষার এই যন্ত্রণার চেয়ে মৃত্যু শ্রেয়। প্রতিটা মুহূর্তে আপনজনেরা অপেক্ষায় থাকে এই বুঝি এলো। এই মনে হয় ফিরে আসবে। এইতো এসেই আপনজনের নাম ধরে ডাকবে। আবারও অস্থির করে তুলবে বোনদেরকে। মায়ের কোলে শুয়ে একদণ্ড শান্তি খুঁজবে। প্রতিদিন অফিস শেষে মায়ের সাথে ফোনে কথা বলবে, বাবার শরীরের খোঁজ নিবে। পরিবারের সুখে দুখে পাশে থাকার জন্য দৌড়ে চলে যাবে।

 

 

নিঁখোজের আগের দিনও উৎপল কথা বলেছে তার বোনের সাথে। জানতে চেয়েছিলো কেমন আছে তার দিদি। প্রতিদিন অফিস শেষ করেই ফোনে সবার খবর নিতো। আহারে!! সেই পরিবার এখন কেমন করে সময় পার করছে? কত স্মৃতি না জানি তাদেরকে নির্ঘুম রাখছে, সেইদিনের পর থেকে। কেমন করে ভুলে থাকবে তারা? কেনইবা ভুলে যাবে?

 

 

উৎপলের পরিবারের মত এখন আমরাও ভয়ে দিন পার করছি। কখন না জানি আমিও নিঁখোজের তালিকা্য চলে যাই।

 

 

এই রাষ্ট্র, এই বিচার ব্যবস্থা, এই আইন শৃঙ্ক্ষলা বাহিনীর উপর তাই আস্থা রাখতে চাই। আপনাদের কাছে মিনতি করে জানাই আপনারা যেখান থেকে পারুন উৎপলের খোঁজ আনুন। কোথায় আছে সে, কেমন আছে? কেন হারিয়ে গেলো ছেলেটি? পরিবারের মুখে হাসি ফিরিয়ে দিন। উৎপলকে ফিরিয়ে দিয়ে আমাদের বিশ্বাসকে ফিরিয়ে দিন। সুস্থ অবস্থায় উৎপল ফিরে আসুক আমাদের সবার মাঝে। তুমি ফিরে এসো উৎপল। গোটা দেশ আজ তোমার উৎকন্ঠায় দিন পার করছে।

 

 
[লীনা পারভীন: কলাম লেখক ও সাবেক ছাত্রনেতা।]

 
সূত্র: পরিবর্তন ডট কম।

Facebook Comments

এ সংক্রান্ত আরো খবর




সম্পাদক: আরিফা রহমান

২৮/এফ ট্রয়োনবী সার্কুলার রোড, ৫ম তলা, মতিঝিল, ঢাকা।
সর্বক্ষণিক যোগাযোগ: ০১৭১১-০২৪২৩৩
ই-মেইল ॥ sangbad24.net@gmail.com
© 2016 allrights reserved to Sangbad24.Net | Desing & Development BY Popular-IT.Com, Server Manneged BY PopularServer.Com