ads

মামলার ভারে যুবদল নেতা মামুন হাসান

মামুন হাসান

এম.উমর ফারুক
বিশেষ প্রতিনিধি, সংবাদ২৪.নেট, ঢাকা

 

 

তুখোর ছাত্রনেতা মামুন হাসান। সদ্য ঘোষিত যুবদলের কমিটিতে সাংগঠনিক সম্পাদক নিয়োগ পেয়েছেন। কিন্তু মামলার জালে আটকা পড়েছে তার জীবন। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের আস্থাভাজন হওয়ায় তার উপর হামলা মামলা ও নির্যাতন বেড়ে যায়।

 

 

গত বুধবার তার সঙ্গে আলাপচারিতায় এসব বিষয় তুলে ধরেন তিনি।

 

 

তখনও হাইস্কুলের গন্ডি পেরোননি। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের মিছিল-মিটিংয়ে অংশ নিতেন নিয়মিত। মিছিলে স্লোগানও ধরতেন সামনে থেকে। বন্ধুদের আড্ডায়ও ছিলেন মধ্যমণি। ক্লাসের দুষ্টুমিতেও ছিলেন সেরা। নবম শ্রেণীতে পড়াকালেই মিরপুরের ওয়ার্ড ছাত্রদলের পদ পয়ে যান ডানপিঠে মামুন হাসান। সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েন রাজনীতিতে। লেখাপড়ার চেয়ে রাজনীতিই হয়ে উঠে তার কাছে ধ্যান-জ্ঞান। তবে রাজনীতির পাশাপাশি পড়াশোনাও চালিয়ে যান। এসএসসি পাস করে ভর্তি হন সিটি কলেজে। তার রাজনীতির গন্ডি এলাকা থেকে নিয়ে যান কলেজপাড়ায়ও। রাজনীতি যেন তার রক্তে মিশে যায়। টান বেড়ে যায় দলের প্রতি। নিয়মিত মিছিল-মিটিংয়ের কারণে জনপ্রিয় হয়ে উঠেন এলাকায়। পেয়ে যান পদোন্নতিও। দায়িত্ব পান মিরপুর থানা ছাত্রদলের সভাপতির।

 

 

৯০ সালের দিকে স্বৈরাচার এরশাদের পতনের দাবিতে মিছিল বের করেন। ওই মিছিলে গুলি চালায় এরশাদের পেটুয়া বাহিনী। ভাগ্যগুণে মামুন হাসান বেঁচে গেলেও গুলিবিদ্ধ হন তার ৬ সহকর্মী। এরশাদের পতনের পর বিএনপি ক্ষমতায় এলে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সদস্য হন। ৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার বিরোধী আন্দোলন শুরু হলে তার বিরুদ্ধে দায়ের হয় একের পর এক মামলা। ওই সময় বোনের বিয়ের আসর থেকেই রাজনৈতিক মামলায় প্রথমবারের মতো গ্রেপ্তার হন। তিন মাস কারাভোগের পর মুক্তি পান।

 

 

এরপর ওই বছরই তিনি ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রদলের সভাপতির দায়িত্ব পান। ওই বছর কুমিল্লা হায়দরাবাদ কলেজ থেকে ডিগ্রি পাস করেন। ওই বছর ফের গ্রেপ্তার হয়ে এক মাস কারাভোগ করেন। ২০০০ সালে ভালবাসার মানুষের সঙ্গে বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হন। ২০০১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর অদৃশ্য কারণে তাকে কারাগারে যেতে হয়।

 

 

২০০২ সালে মহানগরের সভাপতির পদ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নেন। এরপর দলীয় কর্মসূচিতে অংশ নিতেন। ওই বছর পানিতে ডুবে মারা যায় তার শিশু সন্তান। ওয়ান-ইলেভেন সরকার আমলে দলের বিপর্যয়ে ছিলেন মূলস্রোতে দেন। দৃঢ়চেতা ও সাহসী নেতৃত্বের পুরস্কার পেয়েছিলেন মামুন হাসান। ২০১০ সালের দিকে দায়িত্ব দেয়া হয় ঢাকা মহানগর যুবদলের উত্তরের সভাপতির। আর সেটাই কাল হয়ে দাঁড়ায় সুদর্শন এই সাবেক ছাত্রনেতার। আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকার কারণে তার ওপর বয়ে যায় মামলার সিডর।

 

 

২০১১ সাল থেকেই শুরু হয় ফেরারি জীবন। এরপর থেকে আর নিজের বাসায় ঘুমাতে পারেননি। প্রায় প্রতিদিনই তার খোঁজে বাসায় যায় পুলিশ। গ্রেপ্তার এড়াতে থাকেন কৌশলী অবস্থানে। কখনও আত্মীয়-স্বজন, আবার কখনও বন্ধুবান্ধবের বাসায়। চলাফেরাও করতে হয় হিসেব কষে। ফেরারি অবস্থায় ২০১২ সালের শেষদিকে হারান বাবাকে। মামলায় ফেরারি হওয়ায় তার বাসার সব মালামাল ক্রোক করে মিরপুর থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। তাকে না পাওয়ায় নির্যাতনের স্টিমরোলার চালানো হয় তার পরিবারের ওপর।

 

 

২০১৩ সালে ২৬শে ডিসেম্বর রাতে তাকে গ্রেপ্তারে ওই রাতে অভিযান চালানো হয় তার ভাইয়ের বাসায়। কিন্তু পুলিশ তাকে না পেয়ে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায় ভাইয়ের স্ত্রী, মেয়ে ও বোনকে। নির্যাতন করা হয় অসুস্থ বড়ভাইকেও। হাতুড়ি দিয়ে ভাঙা হয় বাসার টাইলস, বাথরুথের কমোড, ফ্রিজ, স্টিলের আলমারি, কাঁচের আসবাবপত্র। কাঁচি দিয়ে কাটা হয় সব কাপড়-চোপড়।

 

 

একই রাতে অভিযান চালানোর হয় স্ত্রীর ভাড়া বাসায়ও। ওই বাসায়ও একইভাবে ভাঙচুর করা হয়। রাজনীতির ইতিহাসে এমন বর্বরতম নির্যাতনের ঘটনায় হতবিহ্বল হয়ে পড়েন তিনি। নির্যাতনের কালো থাবা পড়ে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও। একপর্যায়ে ব্যবসা গুটিয়ে ফেলতে বাধ্য হন। বন্ধ হয়ে যায় আয়ের পথ।

 

 

২০১৫ সালের শুরুর দিকে দ্বিতীয়দফা সরকার বিরোধী আন্দোলনে মামলার সুনামি বয়ে যায় তার ওপর। পূরণ হয় মামলার ডাবল সেঞ্চুরি। এরমধ্যে চার্জশিটভুক্ত রয়েছে ১৯৪টি। যার বেশির ভাগ মামলায় রয়েছে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। দুদফা আন্দোলনে তার হাতে গড়া দুই কর্মী গুম হয়ে যায়। নিহত হয় বাল্যবন্ধুসহ তার ছয় কর্মী।

 

 

এদিকে গত বছরের মাঝামাঝিতে হারান পুলিশের নির্যাতনের পর অসুস্থ হওয়া একমাত্র বড়ভাইকে। একমাস না যেতেই হারান গর্ভধারিণী মাকেও। তাদের জানাজায় শরিক হতে পারলেও মা ও ভাইয়ের কুলখানি করার সুযোগ পাননি। মামুন হাসান বলেন, শুধু রাজনীতি করার অপরাধেই আমার বিরুদ্ধে দুই শতাধিক মামলা দায়ের করা হয়েছে। ছয় বছর ধরে ফেরারি জীবন-যাপন করছি। মাসে একদিন পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। মনে হয় নিজ দেশে আমি পরবাসী।

 

 

অভিমানের সুরে আমার শিশুকন্য আমাকে বলে, বাবা তোমাকে ছাড়াই তো আমরা বড় হয়ে যাচ্ছি।

Facebook Comments

এ সংক্রান্ত আরো খবর




সম্পাদক: আরিফা রহমান

২৮/এফ ট্রয়োনবী সার্কুলার রোড, ৫ম তলা, মতিঝিল, ঢাকা।
সর্বক্ষণিক যোগাযোগ: ০১৭১১-০২৪২৩৩
ই-মেইল ॥ sangbad24.net@gmail.com
© 2016 allrights reserved to Sangbad24.Net | Desing & Development BY Popular-IT.Com, Server Manneged BY PopularServer.Com