ads

জানা চাই করোনারি হৃদরোগের কারণ

হৃদরোগ

সংবাদ২৪.নেট ডেস্ক: চিকিৎসাবিজ্ঞানী, মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীরা করোনারি হৃদরোগের জন্যে ঝুঁকিপূর্ণ কয়েকটি কারণকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করেছেন।

বয়স
বিজ্ঞানীরা বলছেন, বয়স যত বাড়তে থাকে হৃদরোগের আশঙ্কাও তত বাড়তে থাকে। আমরা যদি দেখি, হৃদরোগ সাধারণত কোন বয়সে হয়? অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি হয় চল্লিশ বছর বয়সে এসে বা তার পরে। কেন?

সমাজবিজ্ঞানী এবং মনোবিজ্ঞানীরা এর একটা কারণ খুঁজে বের করেছেন। সেটি হলো, চল্লিশ হচ্ছে এমন একটি বয়স যে বয়সে এসে একজন মানুষ জীবনের অঙ্ক মেলাতে শুরু করেন যে, কী চেয়েছিলাম, আর কী পেলাম?

বিষয়টা আরেকটু স্পষ্ট করা যাক। শৈশব থেকে মানুষের জীবনের প্রতিটি পর্যায়েই তার কিছু স্বপ্ন থাকে। তারুণ্যে পৌঁছে সে দেখে একটি সমৃদ্ধ জীবনের স্বপ্ন-এমন একটি চাকরি বা ব্যবসা করবো, এরকম একটি সামাজিক অবস্থান আমার হবে কিংবা এমন একজন জীবনসঙ্গী বা সঙ্গিনী হবে। একসময় সে বাস্তব জীবনে প্রবেশ করে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তখন শুরু হয় স্বপ্নের সাথে বাস্তবতার দ্বন্দ্ব। তার স্বপ্নের পরিধিও ক্রমশ ছোট হতে থাকে। বাড়তে থাকে না-পাওয়ার অতৃপ্তি আর কষ্ট।

একসময় সে চল্লিশের কোঠায় পৌঁছে যায় বা বয়স চল্লিশ বছর পার হয়, সে তখন ফিরে তাকায় তার ফেলে আসা জীবনের দিকে। নিজেই বুঝতে পারে-যা চেয়েছিলাম তার অনেক কিছুই পাওয়া হয় নি। ভেতরে তখন শুরু হয় এক ধরনের অতৃপ্তি আর অশান্তি। কেউ ভোগেন না-পাওয়ার বেদনায়, কেউ-বা ভুগতে থাকেন বিষণ্নতায়। ‘মেরা জীবন কোরা কাগজ কোরাহি রেহেগায়া…’ বা ‘যা পেয়েছি আমি তা চাই না, যা চেয়েছি কেন তা পাই না….’ হয়ে ওঠে হয়তো তার প্রিয় গান। এই যে দিনের পর দিন তিনি কষ্টে ভোগেন, এটি শুধু মনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না।

এই বিষণ্নতা-আক্রান্ত ও ব্যথাতুর হৃদয়ের প্রভাব নিশ্চিতভাবেই পড়ে তার হৃদযন্ত্রেও।
অন্যান্য মনোদৈহিক রোগগুলোর মতো করোনারি হৃদরোগের অন্যতম প্রধান কারণও মূলত এই হাহাকার। কারণ, জীবনের অঙ্ক যদি না মেলে তবে অন্য সব অঙ্ক বৃথা হয়ে যেতে পারে। একবার যদি এ অতৃপ্তি ভেতরে জেঁকে বসে আর সর্বক্ষণ মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকে যে, যা চেয়েছিলাম তা পেলাম না, কেন পেলাম না, না পেয়ে কী হারালাম; তবে আর রক্ষা নেই। আপনার সমস্ত অর্জন তখন আপনার কাছে ফিকে হয়ে যেতে পারে। ব্যর্থতার অনুভূতি প্রায় সারাক্ষণই আপনাকে তাড়িয়ে বেড়াতে পারে। আর এটিই একসময় হয়ে উঠতে পারে হৃদরোগসহ অন্যান্য মনোদৈহিক রোগের কারণ।

লিঙ্গভেদে
হৃদরোগ হওয়ার প্রবণতা পুরুষদের তুলনামূলক বেশি। তবে মহিলাদের ক্ষেত্রে মেনোপজ অর্থাৎ ঋতুচক্র বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর হৃদরোগের আশঙ্কা বাড়তে থাকে। এছাড়াও মহিলাদের মধ্যে যারা নিয়মিত জন্মবিরতিকরণ ওষুধ সেবন করেন, তাদের করোনারি হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

জেনেটিক বা বংশগত
বাবা-মায়ের হৃদরোগ থাকলে তাদের সন্তানদেরও হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। গবেষকদের মতে, এর মূল কারণ হচ্ছে পারিবারিক ভুল খাদ্যাভ্যাস ও ধূমপানের ইতিহাস। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ একজন মানুষ শৈশব থেকে প্রায় সব ব্যাপারেই পারিবারিক রীতি ও আচার-ঐতিহ্যে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। যেমন দেখা যায়, বাবা ধূমপায়ী হলে সন্তানেরও ধূমপায়ী হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কারণ সে-ও বাবার মতো হতে চায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, স্কুল-জীবনেই সে ধূমপানের প্রতি ঝুঁকে পড়ে।

খাদ্যাভ্যাসও এমনই একটি পারিবারিক ব্যাপার। পরিবারে যেমন খাদ্যাভ্যাস চালু থাকে জীবনের শুরু থেকেই মানুষ সাধারণত সেই খাদ্যাভ্যাসে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। তাই মূলত পারিবারিক ভুল খাদ্যাভ্যাস এবং ধূমপানই বংশগত হৃদরোগের অন্যতম কারণ।

ধূমপান
যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা ইউনিভার্সিটির স্কুল অব পাবলিক হেল্থ ও সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির এক যৌথ গবেষণা রিপোর্টে বলা হয়েছে, অল্প বয়সেই হার্টের রক্তনালী সংকুচিত হয়ে যাওয়া এবং হার্ট অ্যাটাকের জন্যে যেসব কারণকে দায়ী করা হয় তার মধ্যে ধূমপানের অবস্থান শীর্ষে।

এছাড়াও, হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ৪০ বছরের কম বয়সী রোগীদের ওপর একটি জরিপ চালিয়ে দেখা গেছে, তাদের শতকরা ৮৫ ভাগই ছিলো ধূমপায়ী।

উচ্চ রক্তচাপ
করোনারি হৃদরোগের একটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কারণ হচ্ছে অনিয়ন্ত্রিত রক্তচাপ। ধমনীর ভেতর দিয়ে রক্ত প্রবাহিত হওয়ার সময় এটি ধমনীর গায়ে একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় চাপ দেয়। আর এই চাপটা যদি স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে বেড়ে যায়, সেটিই উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন।

অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ থাকলে করোনারি ধমনীর ভেতরের অংশে ক্ষতের সৃষ্টি হয়। রক্তের মধ্যে থাকা কোনো একটি কোলেস্টেরল অণু সেই ক্ষতের জায়গাটিতে আটকে যায়। এভাবে রক্ত চলাচলের পথে পরবর্তীতে একটার পর একটা কোলেস্টেরল অণু একই জায়গায় জমতে থাকে। যার ফলাফল করোনারি ব্লকেজ।

রক্তে কোলেস্টেরলের আধিক্য
হৃদরোগের আরেকটি ঝুঁকি হচ্ছে রক্তে কোলেস্টেরলের আধিক্য, যার অন্যতম কারণ ভুল খাদ্যাভ্যাস, ধূমপান ও শারীরিক পরিশ্রমের অভাব।

ডায়াবেটিস
ডায়াবেটিস একটি নীরব ঘাতক। শরীরের প্রায় সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ওপরই এর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব রয়েছে। হৃৎপিণ্ডও এর ব্যতিক্রম নয়। তাই ডায়াবেটিক রোগীদের ক্ষেত্রে করোনারি হৃদরোগের ঝুঁকি অনেক বেশি। ডায়াবেটিস একাই হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায় প্রায় ৩৩ শতাংশ। আর এর সাথে উচ্চ রক্তচাপ যোগ হলে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৬ শতাংশে।

অতিরিক্ত ওজন এবং মেদস্থূলতা
অতিরিক্ত ওজন যাদের, তাদের শরীরে রক্ত সরবরাহ করতে হৃৎপিণ্ডকে তুলনামূলক বেশি কাজ করতে হয়। এটিও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। মূলত খাবার থেকে পাওয়া ক্যালরির পরিমাণ ও এই ক্যালরি ব্যবহারে অসামঞ্জস্যতাই অতিরিক্ত ওজনের কারণ। মাত্রাতিরিক্ত ওজনের ফলে উচ্চ রক্তচাপ, কোলেস্টেরলের আধিক্য ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকিও বেড়ে যায় অনেকগুণ।

শারীরিক পরিশ্রমের অভাব
আধুনিক ও নাগরিক সুযোগ-সুবিধাপূর্ণ জীবনে সবাই আমরা কমবেশি গা ভাসিয়ে দিয়েছি। অথচ শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয় ও পরিশ্রমহীন অলস জীবনযাপনে অভ্যস্ত যারা, তাদের অকালমৃত্যু ও হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার হার কায়িক পরিশ্রমে অভ্যস্তদের চেয়ে তুলনামূলক বেশি। তাই হয়তো বলা হয়ে থাকে, ‘যত আরাম তত ব্যারাম’।
সবমিলিয়ে এগুলোই করোনারি হৃদরোগের অন্যতম প্রধান ঝুঁকি ও কারণ। এগুলোর একটি বা একাধিক ঝুঁকি যদি একজন মানুষের জীবনে বিদ্যমান থাকে, তবে হৃদরোগের আশঙ্কাও তার সেই অনুপাতে বাড়ে।

অবশ্য করোনারি হৃদরোগের কারণ আলোচনায় এটাই শেষ কথা নয়; চিকিৎসাবিজ্ঞানের সাম্প্রতিক গবেষণাগুলোও তা-ই বলছে। কারণ, কারো কারো ক্ষেত্রে দেখা যায়, অতিরিক্ত ওজন, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস কিংবা মাত্রাতিরিক্ত কোলেস্টেরলÑএসব কোনো সমস্যাই নেই, অথচ তিনি করোনারি হদরোগে আক্রান্ত হয়েছেন। আবার দেখা গেল, ৮০ বছর বয়সেও বাবার হৃদযন্ত্র দিব্যি সুস্থ, কিন্তু ছেলের ৪০ না পেরোতেই হার্ট অ্যাটাক।

করোনারি হৃদরোগের পেছনে কি তাহলে এগুলো ছাড়াও কোনো গুরুত্বপূর্ণ ও উল্লেখযোগ্য কারণ আছে? আছে বৈকি। সেটি হলো, জীবন সম্পর্কে আমাদের ভুল দৃষ্টিভঙ্গি অর্থাৎ ভ্রান্ত জীবনদৃষ্টি এবং এ থেকে সৃষ্ট স্ট্রেস বা মানসিক চাপ, যাকে আমরা সহজ ভাষায় বলতে পারি টেনশন। পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে এ বিষয়টি আমাদের কাছে ধীরে ধীরে আরো স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

Facebook Comments

এ সংক্রান্ত আরো খবর




সম্পাদক: আরিফা রহমান

২৮/এফ ট্রয়োনবী সার্কুলার রোড, ৫ম তলা, মতিঝিল, ঢাকা।
সর্বক্ষণিক যোগাযোগ: ০১৭১১-০২৪২৩৩
ই-মেইল ॥ sangbad24.net@gmail.com
© 2016 allrights reserved to Sangbad24.Net | Desing & Development BY Popular-IT.Com, Server Manneged BY PopularServer.Com