ads

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি : বাংলার স্বাপ্নিকের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন

মো. মুজিবুর রহমান

মো. মুজিবুর রহমান

 

আজকের দিনটি বাংলাদেশ ও বাঙালির ইতিহাসে এক গুরুত্ববহ দিন। পাশাপাশি বাঙালির অনন্য একটি দিবস। জাতীয় জীবনে এমন দু’একটি দিন আসে যা আপন মহিমায় উজ্জ্বল। তেমনি একটি দিন ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি। আজ ঐতিহাসিক ১০ জানুয়ারি। বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস। বাংলাদেশের লাখো কোটি বাঙালির দাবি ও বিশ্ব জনমতের চাপের প্রেক্ষিতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগার হতে মুক্তিলাভ করে তাঁর প্রাণপ্রিয় দেশে এই দিনে ফিরে আসেন।

 

দীর্ঘ  ২৩ বছরের  সংগ্রাম, ত্যাগ-তিতিক্ষা, আন্দোলন ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের পর বিধ্বস্ত বাংলাদেশকে সামনে এগিয়ে নেয়ার প্রশ্নে বাঙালি যখন বাস্তবতার মুখোমুখি- তখন পাকিস্তানের  বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেয়ে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন বাংলার স্বাপ্নিক সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ২৯০ দিন  পাকিস্তানের কারাগারে মৃত্যুযন্ত্রণা শেষে ১৯৭২ সালের এই দিনে লন্ডন-দিল্লি হয়ে মুক্ত স্বাধীন স্বদেশের মাটিতে ফিরে আসেন তিনি।

 

পাকিস্তানের কারাগারে বঙ্গবন্ধুর গোপনে বিচারের কাজ করে তাঁকে হত্যার সকল প্রকার আয়োজন সম্পন্ন  করেন পাকিস্তানের সামরিক জান্তা প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান। বঙ্গবন্ধুর প্রহসনের বিচার বন্ধ করে মুক্তির জন্য পাকিস্তানের সামরিক জান্তাকে চাপ দেয়ার বিষয়ে অনুরোধ জানিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ৬৭টি দেশের সরকারপ্রধান ও রাষ্ট্রপ্রধানকে চিঠি দেন। অন্যদিকে তিনি ইউরোপের ৫টি দেশ ও যুক্তরাষ্ট্র সফর করে বিশ্বজনমত বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের অনুকূলে আনতে সক্ষম হন। ফলে পাকিস্তানের সামরিক জান্তার পক্ষে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা সম্ভব হয়নি। ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু পকিস্তানি কারাগার থেকে মুক্তি পান। একটি পাকিস্তান সামরিক বিমানে খুব গোপনে বঙ্গবন্ধুকে লন্ডনে পাঠিয়ে দেয়া হয়। ঐ বিমানে আরও ছিলেন ড.  কামাল হোসেন ও তাঁর স্ত্রী হামিদা হোসেন।

 

লন্ডনে ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি দুপুরের এক প্রেস কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়।  সেই প্রেস কনফারেন্সে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ভাষণ দেন। সেখানে প্রধানত চারটি বিষয়কে ঘিরে ভাষণ  দেন। এ চারটি বিষয় ছিল (০১) মহান মুক্তিযুদ্ধে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অভিনন্দন জানানো; (০২)  যেসব দেশ মুক্তিযুদ্ধে  সহযোগিতা বা সমর্থন দিয়েছে, তাদের প্রতি কুতজ্ঞতা এবং যেসব দেশ সমর্থন করেনি অথচ জনগণ সমর্থন দিয়েছে, তাদের প্রতি ধন্যবাদ জানানো ; (০৩) সকল দেশের কাছে স্বাধীনতার স্বীকৃতি চাওয়া ;  (০৪) পুনর্বাসন কিংবা পুনর্গঠনের জন্য সাহায্য চাওয়া। এ চারটি বিষয় ধরে প্রেস কনফারেন্সের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু বিশ^বাসীর কাছে তাঁর ভাষণ তুলে ধরেছিলেন।

 

লন্ডনে সময় তখন ভোর ৬.০০, ৯ জানুয়ারি ১৯৭২ সাল। লন্ডন হিথ্রো বিমান বন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে  পৌঁছান বঙ্গবন্ধু। তাঁকে স্বাগত জানায় ব্রিটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রী ও কমনওয়েলথ বিভাগের প্রধান ইয়ান  সাদারল্যান্ড ও লন্ডনে নিযুক্ত ভারতীয় হাই কমিশনার আপা বি পন্থ। যতদূর জানা গেছে যে, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর বৈঠকের ব্যবস্থা করে দেন ইয়ান সাদারল্যান্ড। আর ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে যোগাযোগ করে দেন  আপা বি পন্থ । ত্রিশ মিনিট ধরে চলেছিল বঙ্গবন্ধু-ইন্দিরা টেলিফোন আলাপচারিতা।

 

স্বদেশে ফেরার জন্য বঙ্গবন্ধু উঠে বৃটিশ রাজকীয় বিমান বহরের কমেট জেটে। বাংলাদেশে ফেরার পথে বিমানটি দুই ঘন্টার যাত্রা বিরতি করে দিল্লীতে। ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি  ভি ভি গিরি ও প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী বঙ্গবন্ধুকে অভ্যর্থনা জানান। দিল্লিতে বিশাল নাগরিক সংবর্ধনায় বঙ্গবন্ধু ভাষণ দেন।  দিল্লিতে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বঙ্গবন্ধু এক বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন। সে বৈঠকে তিন মাসের মধ্যে বাংলাদেশে অবস্থানরত ভারতীয় সৈন্যদের ফিরিয়ে আনার বিষয়টি আলোচনা হয়।

 

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারির সকাল থেকেই তেজগাঁও বিমানবন্দরের রাস্তার দু’পাশে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলো সারিবদ্ধ মানুষ। বিমান বন্দর থেকে পল্টনের রেসকোর্স ময়দান (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান)-এক  বিপুল জনসমুদ্র। যা বিশ্ববাসী ও বাঙালিরা প্রত্যক্ষ করেছিল। বাংলাদেশ বেতার থেকে ধারাবিবরণী দেয়া হচ্ছিল। বিমানবন্দর ও রাস্তার দু’পাশে অপেক্ষমাণ জনতা। সবার চোখেমুখে অন্যরকম উত্তেজনা। বাঙালির মহান নেতা আসছেন। যিনি বাঙালী জাতিকে মুক্তির মন্ত্রে উজ্জীবিত করেছিলেন। লাখো লাখো মানুষের ভীড় রাজপথ জুড়ে। কণ্ঠে ’জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’। অবশেষে অপেক্ষার পালা শেষ। বঙ্গবন্ধু ফিরে এলেন স্বদেশে। যে দেশ এবং  যে স্বাধীনতার জন্য জীবনবাজি রেখেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, সেই মাটিতে পা দিয়েই আবেগে কেঁদে ফেলেন তিনি। বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানাতে যারা গিয়েছিলেন, অস্থায়ী সরকারের সদস্য, মুক্তিযোদ্ধা তারাও অশ্র“সজল নয়নে বরণ করেন ইতিহাসের এই বরপুত্রকে। তেজগাঁও বিমানবন্দরে বঙ্গবন্ধুকে বহনকারী বিমানটি অবতরণ করার পর খোলা গাড়িতে দাঁড়িয়ে জনসমুদ্রের ভেতর দিয়ে রেসকোর্স ময়দানে  এসে পৌঁছুতে আড়াই ঘণ্টা সময় লাগে। সেদিনকার রেসকোর্স ময়দান ছিল লোকে লোকারণ্য। বাঙালি জাতি তেজোদীপ্ত ‘জয় বাংলা’ শ্লোগানে তাদের অবিসংবাদিত  নেতা বঙ্গবন্ধুকে স্বাগত জানায়।

 

প্রাণপ্রিয় স্বদেশে ফিরে জাতির পিতার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রেসকোর্স ময়দানে প্রায় ১৭ মিনিট জাতির উদ্দেশে গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেন। যা ছিল জাতির জন্য দিক নির্দেশনা। বাংলাদেশের আদর্শগত ভিত্তি কী হবে, রাষ্ট্র কাঠামো কী ধরনের হবে, পাকিস্তানি বাহিনীর সাথে যারা দালালী ও সহযোগিতা করেছে তাদের কী হবে, বাংলাদেশকে বহির্বিশ্ব স্বীকৃতি দেওযার জন্য অনুরোধ, মুক্তিবাহিনী, ছাত্র সমাজ, কৃষক, শ্রমিকদের কাজ কী হবে, এসব বিষয়সহ বিভিন্ন দিক নিয়ে যে নিদের্শনামূলক ভাষণ দিয়েছিলেন সেই ভাষণকে একজন প্রাজ্ঞ রাষ্ট্রনায়কের নীতিনির্ধারণী ভাষণ বলে উল্লেখ করা যায়। তিনি ডাক দিলেন দেশ গড়ার সংগ্রামে। রেসকোর্স ময়দানে উপস্থিত জনতা দু’হাত তুলে  সেই সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছিলেন।

 

বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চ যে  রেসকোর্স ময়দানে বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতা ও মুক্তি সংগ্রামের ডাক দিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে বলেছিলেন আর সেই রেসকোর্স ময়দানে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বাধীনতার পূর্ণতা সম্পর্কে স্পষ্ট করে তিনি বলেন, “আজ থেকে আমার অনুরোধ, আজ থেকে আমার আদেশ. আজ থেকে আমার হুকুম ভাই হিসেবে. নেতা হিসেবে নয়, প্রেসিডেন্ট হিসেবে নয়, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, আমি তোমাদের ভাই, তোমরা আমার ভাই, এই স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়ে যাবে যদি আমার বাংলার মানুষ পেট ভরে ভাত না পায়। এই স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি আমার বাংলার মা-বোনেরা কাপড় না পায়, এই স্বাধীনতা পূর্ণ হবে না। যদি এ দেশের মা- বোনেরা ইজ্জত ও কাপড় না পায়। এই স্বাধীনতা আমার পূর্ণতা হবে না যদি এ দেশের মানুষ, যারা আমার যুবক শ্রেণী আছে তারা চাকরি না পায় বা কাজ না পায়।”

 

দেশের উন্নয়নের জন্য ডাক দিলেন এভাবে, “যথেষ্ট কাজ পড়ে রয়েছে। আপনারা জানেন, আমি সমস্ত জনগণকে চাই, যেখানে রাস্তা ভেঙ্গে গেছে, নিজেরা রাস্তা করতে শুরু করে দেও। আমি চাই, জমিতে যাও, ধান-বোনাও, কর্মচারীদের বলে দেবার চাই, একজন ঘুষ খাবেনা না, মনে রাখবেন, তখন সুযোগ ছিলোনা, আমি ক্ষমা করব না।”

 

যাঁদের প্রাণের ও ত্যাগের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে সেদিন বঙ্গবন্ধু ভাষণের শুরুতে বলেন, “স্মরণ করি আমার বাংলাদেশের ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, বুদ্ধিজীবী, সেপাই, পুলিশ, জনগণকে, হিন্দু, মুসলমানকে হত্যা করা হয়েছে। তাদের আত্মার মঙ্গল কামনা করে, তাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে আমি আপনাদের কাছে দুই একটা কথা বলতে চাই। ”

 

পাকিস্তানে সামরিক আদালতে বঙ্গবন্ধুর বিচার ও ফাঁসির হুকুম সম্পর্কে তাঁর ভাষণের এক পর্যায়ে বলেছিলেন “ আমার সেলের পাশে আমার জন্য  কবর খোড়া হয়েছিল। আমি প্রস্তুত হয়েছিলাম। বলেছিলাম, আমি বাঙালি, আমি মানুষ, আমি মুসলমান, একবার মরে দুইবার মরে না। আমি বলেছিলাম, আমার মৃত্যু এসে থাকে যদি আমি হাসতে হাসতে যাব। আমার বাঙালি জাতকে অপমান করে যাব না। তোমাদের কাছে ক্ষমা চাইব না এবং যাবার সময় বলে যাব, জয় বাংলা, স্বাধীন বাংলা, বাঙালি আমার জাতি, বাংলা আমার ভাষা, বাংলার মাটি আমার স্থান।” -এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সহজে অনুমান করা যায় যে, জেল-জুলুম-অত্যাচার কখনোই বঙ্গবন্ধুকে বিমর্ষ বা চিন্তিত করতে পারেনি। তিনি ছিলেন অকুতোভয় ও বলিষ্ঠ আত্মপ্রত্যয়ী ব্যক্তিত্বের অধিকারী একজন সাহসী নেতা। বাঙালি জাতির প্রতি অবিচল আস্থা ছিল তাঁর। স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানে সেদিন বলেছিলেন “এই বাংলাদেশে হবে সমাজতন্ত্র ব্যবস্থা, এই বাংলাদেশে হবে গণতন্ত্র, এই বাংলাদেশ হবে ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র।”

 

মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান যেমন সত্য তেমনি এ দেশের মাটিতে ভারতীয় সৈন্যের অনির্দিষ্টকালের অবস্থানের ফলে প্রশ্নবিদ্ধ হওয়াও ছিলো এক বাস্তব সত্য।

 

সে ভেবে বঙ্গবন্ধু দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেন, “যারা জানতে চান আমি বলে দেবার চাই, আসার সময় দিল্লিতে শ্রী মতি ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে যে সময় আলোচনা হয়েছে। আমি আপনাদের বলতে পারি, আমি জানি তাঁকে। তাঁকে আমি শ্রদ্ধা করি। সে পণ্ডিত নেহেরুর কন্যা, সে মতিলাল নেহেরুর ছেলের মেয়ে। তারা রাজনীতি করছে। ত্যাগ করছে তারা আজকে সেখানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হয়েছে। যেদিন আমি বলব সেই দিন ভারতের সৈন্য বাংলার মাটি ছেড়ে চলে যাবে। এবং তিনি আস্তে আস্তে কিছু সৈন্য সরায়ে নিচ্ছে।”

 

তিনি জনগণকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “আমি দেখায় দেবার চাই দুনিয়ার কাছে শান্তিপূর্ণ বাঙালি রক্ত দিতে জানে, শান্তিপূর্ণ বাঙালি শান্তি বজায় রাখতেও জানে।”

 

মহান মুক্তিযুদ্ধে বহির্বিশ্বের সমর্থনকে অকুণ্ঠ চিত্তে স্বীকার করেন এ ভাষণে। পাশাপাশি তিনি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা জানান ভারত সরকার, সে দেশের জনগণ ও তাদের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে। কৃতজ্ঞতা জানান ব্রিটেন, জার্মান, ফ্রান্স ও সোফিয়েত ইউনিয়নকে। আবার বঙ্গবন্ধু মার্কিন জনগণকে ধন্যবাদ জানান, সরকারকে নয়। এখানে উল্লেখ করতে হয়, তৎকালীন মার্কিন সরকার আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করেনি। কিন্তু সে দেশের জনগণ আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করেছিল। যুদ্ধাপরাধীদের গণবিরোধী ভূমিকা পালন করার ফলে মুক্তিযদ্ধ উত্তর প্রতিহিংসাপরায়ণবশে অনেক সহিংস ঘটনা ঘটে।

 

এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু সর্তকবাণী উচ্চরণ করেন তাঁর ভাষণে. “ আজ আমার কারো বিরুদ্ধে প্রতিহিংসা নাই, একটা মানুষকে তোমরা কিছু বলোনা, অন্যায় যে করেছে তাকে সাজা দেবো। আইন শৃঙ্খলা তোমাদের হাতে নিও না।”  পাকিস্তানের সাথে ন্যূনতম বাঁধন রাখার প্রস্তাবকে নাকচ করে বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণে বলেন, “ আজ বলছি ভুট্টো সাহেব, সুখে থাক। বাঁধন ছুটে গেছে। আর না। ”

 

সেদিনের ভাষণের এক পর্যায়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর  রচিত “সাত কোটি বাঙালি, হে বঙ্গ জননী,  রেখেছো  বাঙালি করে মানুষ করোনি। -এই পঙক্তি উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধু বলেন, “. . . প্রমাণ হয়ে গেছে, আমার বাঙালি  আজ মানুষ। আমার বাঙালি আজ দেখিয়ে দিয়েছে।”

 

আবার  নতুন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি কূটনৈতিক দিক দিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সে বিবেচনায় বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানের জন্য বঙ্গবন্ধু  তাঁর ভাষণে উদাত্ত আহবান জানান এ ভাবে, “দুনিয়ার সমস্ত রাষ্ট্রের কাছে আমি সাহায্য চাই। আমার বাংলাদেশকে তোমার রিকগনাইজ করো। জাতিসংঘে স্থান দেও, দিতে হবে। উপায় নাই। দিতে হবে, আমি, আমরা হার মানব না। আমরা হার মানতে জানি না।” তথ্য মোতাবেক আমরা জানি ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি  পর্যন্ত ভারত ও ভূটান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করেছিল।

 

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারির ভাষণটি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের একটি  নীল নকশা। বঙ্গবন্ধুর ভাষণে সেদিন সবাইকে দেশ গড়ার ডাক দেন। পাশাপাশি ভবিষ্যত বাংলাদেশের রূপরেখা ও নতুন দেশ হিসেবে দেশ পুনর্গঠনের জন্য আহবান। পূর্বপ্রস্ততিহীন এ সংক্ষিপ্ত ভাষণে অনেকগুলো বিষয়ের প্রতি বঙ্গবন্ধু দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। যা রাষ্ট্র ও জাতি গঠনে তাৎপর্য বহন করে। পাশাপাশি বহন করে বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রনায়কোচিত দূরদৃষ্টির। ভাষণটি ছিল সংক্ষিপ্ত। এ সংক্ষিপ্ত ভাষণেই তিনি বাঙালি জাতি ও ভবিষ্যত বাংলাদেশ গড়ার প্রক্রিয়া সম্পর্কে সুষ্পষ্ট ধারণা দিতে সক্ষম হন। এ ভাষণটি অন্যান্য ভাষণের ন্যায় আমাদের জাতীয় জীবনের অমূল্য সম্পদ ও অন্তহীন প্রেরণা। সেই সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর আলোকিত সোনার বাংলা বির্নিমাণে অবিনাশী অনুপ্রেরণা, পাথেয় ও দিক নিদের্শনা।

 

১০ জানুয়ারি ক্যালেন্ডারের পাতায় যেমন ফিরে আসে ঠিক তেমনি সকলের  চৈতন্যে ফিরে আসেন বাঙালির সিংহ পুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলাদেশের সংকট দূরীকরণে বঙ্গবন্ধুর আদর্শই আমাদের শক্তির প্রেরণা। এই দেশের সবকিছুতেই  বঙ্গবন্ধু মিছে  রয়েছেন উন্নত শির ও মহিমা নিয়ে। জাতির অনৈক্য, বিভেদ, বিস্বাদে ঐক্যের দৃঢ়মূল বন্ধন হিসেবে বঙ্গবন্ধুর রেখে যাওয়া আদর্শকে স্থান দিতে হবে। তা না হলে জাতি বারংবার হোঁচট খাবে। পথ হারাবে। জানতে পারবে না বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস। অনেক বিবেচনায় বলা যায় যে, এই ১০ জানুয়ারির তারিখটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের অংশ। প্রতিবছর ১০জানুয়ারি বাঙালি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। ২০১৭ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ৪৬তম দিবস।

 

[লেখক: কলেজ শিক্ষক এবং আর্কাইভস ৭১-এর প্রতিষ্ঠাতা।]

Facebook Comments

এ সংক্রান্ত আরো খবর




সম্পাদক: আরিফা রহমান

২৮/এফ ট্রয়োনবী সার্কুলার রোড, ৫ম তলা, মতিঝিল, ঢাকা।
সর্বক্ষণিক যোগাযোগ: ০১৭১১-০২৪২৩৩
ই-মেইল ॥ sangbad24.net@gmail.com
© 2016 allrights reserved to Sangbad24.Net | Desing & Development BY PopularITLtd.Com, Server Manneged BY PopularServer.Com