ads

প্রতারণার কবলে ক্রেতারা: মূল্যছাড়ের হিড়িক

মূল্যছাড়

সংবাদ২৪.নেট ডেস্ক : রাজধানীর বিপণিবিতানগুলোতে বিক্রি বাড়াতে এভাবেই মূল্যছাড়ের বিজ্ঞাপন টানানো হয়েছেরাজধানীর ছোট-বড় বিপণিবিতানগুলোতে শীতকালীন বিভিন্ন পণ্যের ওপর মূল্যছাড়ের হিড়িক চলছে। মূলত বছর শেষে পণ্যের বিক্রি বাড়াতেই ব্যবসায়ীরা এ কৌশল নিয়েছেন। তবে দোকানের সামনে ছাড়ের বড় বড় চটকদার বিজ্ঞাপন টানানো হলেও এসব পণ্য কিনে ক্রেতারা নিয়মিত প্রতারিত হচ্ছেন।

বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ফুটপাত থেকে শুরু করে অভিজাত বিপণিবিতানগুলোতে ২০ শতাংশ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যছাড়ের বড় বড় বিজ্ঞাপন শোভা পাচ্ছে। এসব দোকানে সারাক্ষণ ক্রেতাদের ভিড় লেগে থাকলেও সন্ধ্যার পরে তা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। তবে পণ্যের গুণগত মান ও দাম নিয়ে যেমন প্রশ্ন ক্রেতাদের, তেমনি অনেক দোকানের ভেতরে বা শো-রুমে গিয়ে বড় ছাড়ের পণ্য খুঁজে পাওয়া যায় না। ক্রেতাদের অভিযোগ, এসব দোকানে মূলত নিম্ন মানের মেয়াদ উত্তীর্ণ পণ্য ছাড় দিয়ে বিক্রি করা হয়। যেখানে ক্রেতাদের স্বার্থ কখনোই বিবেচনা করা হয় না।

রাজধানীর কারওয়ান বাজারের প্রজাপতি গুহার উত্তর পাশে একটি একচালা বড় ঘরের সামনে বাটা জুতার ওপর ৮০ শতাংশ পর্যন্ত মূল্য ছাড়ের বড় ব্যানার টাঙানো। ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, পুরুষ-মহিলাদের ছোট-বড় বিভিন্ন সাইজের জুতা এলোমেলভাবে রাখা আছে। দামও অনেক কম। তবে, বেশির ভাগ জুতাতেই ৫০ শতাংশ বা তার কম ছাড়। ৮০ শতাংশ ছাড়ের জুতা কোথায় জানতে ওই দোকানের এক কর্মচারী ছোট বাচ্চাদের কিছু জুতা দেখিয়ে বলেন, ‘এগুলোর দাম ১৩৯০ টাকা। আর ৮০ শতাংশ ছাড়ে বর্তমান মূল্য মাত্র ১০০ টাকা।’ এই কর্মচারী আরও জানান, এখানে দৈনিক প্রায় এক থেকে দেড় লাখ টাকার জুতা বিক্রি হয়। তবে এখানে তুলনামূলক কম দামে ভালো ব্র্যান্ডের পণ্য কিনে ক্রেতারা খুশি হলেও সপ্তাহ পার না হতেই তা মস্নান হয়ে যাচ্ছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, দেশের মধ্যে কারওয়ান বাজার ও টঙ্গীতে বাটার দুটি আউটলেট সেন্টার রয়েছে। এখানে তাদের বিভিন্ন ত্রুটিযুক্ত জুতা কম দামে বিক্রি করা হয়। তবে এগুলো ভালো জুতার মূল দামের ওপরে ছাড় দেয়া হচ্ছে বলে প্রচার করা হয়। মূলত যেসব জুতার রং বা ফিনিশংয়ে সমস্যা থাকে এবং সাইজ ও সেলাইয় ঠিকমতো হয় না, তা এসব আউটলেটে পাঠিয়ে দেয় কোম্পানি। এ ছাড়া বিভিন্ন শো-রুমে দীর্ঘ দিন ধরে পড়ে থাকা অবিক্রীত জুতা, মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে এমন জুতাগুলোও এখানে বিক্রি করা হয়। তবে বিষয়টি অস্বীকার করেছেন আউটলেটের দায়িত্বে থাকা স্টোর ম্যানেজার জাহিদ হোসেন। মুঠোফোনে তিনি বলেন, তাদের জুতার মান ভালো। এ জন্যই প্রচুর সেল হয়। এখন শেষ পর্যায়ে হয়তো কিছু জুতায় সমস্যা থাকতে পারে।

কিন্তু ভুক্তভোগী এক ক্রেতা জানান, ২৫০ টাকা দিয়ে একজোড়া সেন্ডেল কিনে মাত্র সাত-আট দিন ব্যবহার করার পর এটা আর ব্যবহার করতে পারেননি তিনি। চামড়ার সেন্ডেলটি সপ্তাহ না পার হতেই বিভিন্ন জায়গায় রং খসে পড়ে। দেখে বোঝার উপায় নেই, এটি নতুন জুতা। পরে ওই শো-রুমে যোগাযোগ করা হলে তারা সাফ জানিয়ে দেন, ‘সমস্য আছে দেখেই ছাড় দেয়া হচ্ছে। আমরা আগেই বলেছি দেখে নিন।’

গত শুক্রবার রাজধানীর শ্যামলী থেকে বিজ্ঞাপনে আকৃষ্ট হয়ে এলিফ্যান্ট রোডে জুতা কিনতে যান রাশেদ নামের এক শিক্ষার্থী। আধা ঘণ্টার মতো ঘুরে খুঁজে পান সেই কাঙ্ক্ষিত শো-রুম। নামকরা বে ব্র্যান্ডের শো-রুমটিতে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত মূল্য ছাড়ের বড় বড় বিজ্ঞাপন শোভা পাচ্ছে। কিন্তু শো-রুমের ভেতরে ৬০ শতাংশ মূল্যছাড়ের মাত্র দুই জোড়া জুতা খুঁজে পান তিনি। বাকি কিছু জুতাতে ১০ থেকে ২০ শতাংশ মূল্যছাড় খুঁজে পেলেও অধিকাংশ জুতাই মূল দামে বিক্রি করা হচ্ছে।

জানতে চাইলে শো-রুমের কর্মচারীরা বলেন, ‘তাদের নির্দিষ্ট কিছু জুতার ওপর ছাড় দেয়া হয়েছে। ছাড়ের জুতা আগেই বিক্রি হয়ে যাওয়ায় জুতার সংখ্যা কম।’
এদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এলিফ্যান্ট রোডের এক দোকানের কর্মচারী জানান, সব ক্রেতাই ছাড় দেয়া পণ্যে আকৃষ্ট হন। এ অবস্থায় বাধ্য হয়ে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়ে ওটাতে ছাড় লিখে দেন। কারণ নিম্ন মানের পণ্য দিলে তো আর কাস্টমার আসবেন না। একই এলাকার ‘লং লাইফ সুজ’ নামের একটি দোকানে ৮০ শতাংশ জুতার ওপর ছাড় লেখা থাকলেও ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, জুতায় শুধু বর্তমান মূল্য লেখা রয়েছে। পূর্বের কোনো মূল্য কোথাও উল্লেখ নেই। জানতে চাইলে দোকানের স্বত্বাধিকারী জানান, মূল্যের ওপরে ছাড় কত তা তারা বলেননি। তাদের দোকানের প্রায় ৮০ শতাংশ জুতাই ছাড়ে বিক্রি করছেন এবং শীতকাল এলে সবাই ছাড় দেয়, তাই তিনিও ছাড় দিয়েছেন। পাশের লোটাস বাজার নামক দোকানে ২৫ শতাংশ ছাড় চলছে। ভেতরে গিয়ে জানা যায়, শুধু মহিলাদের নির্দিষ্ট কিছু জুতাতে ছাড় দিচ্ছেন তারা। এ ছাড়া রাজধানীর উত্তরা, খিলক্ষেত, মিরপুর, নিউমার্কেট, পল্টন, মৌচাক, মালিবাগ, গুলিস্তানসহ প্রায় সব এলাকাতেই জুতা ও শীতকালীন বিভিন্ন পোশাকের ওপর মূল্যছাড়ের নামে এমন প্রতারণার চিত্র দেখা যায়।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনের ৪১ ধারায় বলা আছে, কেউ জেনে ভেজাল পণ্য বিক্রি করলে তিন বছরের কারাদ- বা দুই লাখ টাকা জরিমানা। একই আইনের ৪৪ ধারা অনুযায়ী মিথ্যা বিজ্ঞাপন দিয়ে ক্রেতাদের প্রতারিত করলে এক বছরের কারাদ- বা দুই লাখ টাকা জরিমানা এবং আইনটির ৫১ ধারা অনুযায়ী মেয়াদ উত্তীর্ণ পণ্য বিক্রি করলে তিন বছরের কারাদ- ও জরিমানার বিধান থাকলেও অজ্ঞাত কারণে এসব ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে তা কার্যকর হচ্ছে না।

সুনির্দিষ্ট আইন থাকার পরও কেন ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না_এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও অঞ্চল-৫-এর নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম অজিয়র রহমান বলেন, বিভিন্ন খাদ্য-জাতীয় পণ্যের ক্ষেত্রে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করলেও এসব পণ্যের ব্যাপারে সার্বক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া হয় না। গত রমজান ও দুই ঈদের আগে বেশ কয়েকটি অভিযানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব পণ্যের মূল্য নির্ধারণের সুনির্দিষ্ট কোনো মানদ- না থাকায় অনেক সময় ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয় না। তবে ভোক্তা অধিকার আইন অনুযায়ী কোনো ক্রেতা প্রতারিত হলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এ ব্যাপারে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম লস্কর বলেন, লোকবল সংকটের কারণে অনেক কিছুই করতে পারেন না তারা। তবে, কেউ দরখাস্ত দিলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।-যায়যায়দিন

Facebook Comments

এ সংক্রান্ত আরো খবর




সম্পাদক: আরিফা রহমান

২৮/এফ ট্রয়োনবী সার্কুলার রোড, ৫ম তলা, মতিঝিল, ঢাকা।
সর্বক্ষণিক যোগাযোগ: ০১৭১১-০২৪২৩৩
ই-মেইল ॥ sangbad24.net@gmail.com
© 2016 allrights reserved to Sangbad24.Net | Desing & Development BY Popular-IT.Com, Server Manneged BY PopularServer.Com