ads

ঈর্ষণীয় অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ

পদ্মা সেতু

কাইয়ুম আহমেদ

 

শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারীর অবস্থা, দারিদ্র্য দূরীকরণ ইত্যাদি সামাজিক খাতে গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ অনেক এগিয়েছে। বাংলাদেশ আর তলাবিহীন ঝুড়ি নয়। হাঁটছে মধ্যম আয়ের পথে। বিশ্ব অর্থনীতিতে গুরুত্ব পাচ্ছে দেশের পণ্য ও জনশক্তি রফতানি, বিনিয়োগ, সড়ক ও রেল যোগাযোগ এবং তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়ন। এ অগ্রগতিকে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকেরা ঈর্ষণীয় বলে বর্ণনাও করেছেন। বিশ্বব্যাংকও বলছে, নিম্ন আয়ের দেশ থেকে বেরিয়ে এসেছে বাংলাদেশ। দেশটি এখন থেকে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে পরিচিত হবে। এ অগ্রগতি আমেরিকা, ব্রিটেন, কানাডা, জাপান, ফ্রান্স ও চীনসহ অনেক দেশকে আগ্রহী করে তুলছে। রাজনীতিতেও ছিল না উত্তাপ, সহিংসতা। ওয়াটারহাউস কুপারসও (পিডব্লিউপি) বলেছে, ২০৫০ সালে বিশ্বের ২৩তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ হবে বাংলাদেশ। এসবই ২০১৬ সালের আশা জাগানিয়া ঘটনা।

 

তবে হতাশাও কম জাগেনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি, রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংকের দুর্নীতি, রেমিট্যান্স কমে আসা অর্থনীতির চাকাকে থামিয়ে দিতে কিছুটা চেষ্টা করে। এ ছাড়া জঙ্গি উত্থান ঘটনাও অগ্রগতির পথে কাঁটা হয়ে দাঁড়ায়। যদিও তা ছিল ক্ষণস্থায়ী। পাট ও পাটজাত দ্রব্য, চা, কৃষিজ পণ্য রফতানিতেও সুখবর ছিল না। সুখবর ছিল না গণপরিবহন নিয়ে চলা দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধানে।

 

সব মিলিয়ে বলা যায়, বিদায়ী বছরের অর্থনীতির সামগ্রিক চিত্র ছিল ইতিবাচক। বিশেষজ্ঞদের মতে, পদ্মা সেতু হয়ে গেলে জিডিপি ৯ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। এতে করে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে এক অপ্রতিরোধ্য গতিতে। বাংলাদেশ আজ চাল রফতানি করছে, মাছ বা প্রোটিন উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে চতুর্থ, তা ছাড়াও তৈরি পোশাক রফতানিতে দ্বিতীয়। আমাদের শিক্ষার হার ৭০ ভাগ ছাড়িয়েছে। ফরেন কারেন্সি রিজার্ভ ছাড়িয়েছে ২৯ বিলিয়ন ইউএস ডলার। মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৪৬৬ মার্কিন ডলার। জিডিপি ৭ দশমিক দুই শতাংশ। এসব বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, মূল্যস্ফীতি এখন স্থিতিশীল। অর্থনীতির সূচকে স্বস্তি এসেছে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও খাদ্যপণ্যের দাম কম থাকার কারণে। আগের বছরের মতোই আছে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি। এক বছরে খুব বেশি উন্নতি হয়েছে সেটা বলা যাবে না। কারণ অর্থনীতির প্রধান সূচকগুলোতে বড় ধরনের অবনতি হয়েছে। রেমিট্যান্স প্রবাহে নেতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহও সন্তোষজনক অবস্থায় নেই। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঘোষণা দেওয়া ঋণপ্রবাহেও অর্জিত হচ্ছে না। সব মিলিয়ে বিদায়ী বছরে বিনিয়োগে ‘কাক্সিক্ষত উদ্দীপনা’ দেখতে পাচ্ছেন না সাবেক এ উপদেষ্টা। তবে তিনি বলেছেন, এ থেকে উত্তরণে বেসরকারি ও সেবা খাতকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

 

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর অর্থনীতিবিদ ড. আতিউর রহমান বলেন, গত সাত বছরে সরকারে সফলতা ব্যাপক। দারিদ্র্য বিমোচন হয়েছে, জিডিপি গ্রোথ ৭ শতাংশ হয়েছে। উন্নত দেশ গড়তে সরকার যে পরিকল্পনা করছে, সেসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নজর দিতে হবে। শিক্ষার মান খারাপ, নজর দিতে হবে। প্রশিক্ষণের দিকে নজর দিকে হবে (স্কিল ডেভেলপমেন্ট)। সম্ভব হলে মানবসম্পদ উন্নয়ন নামে মন্ত্রণালয় গঠন করা যেতে পারে।

 

এ অর্থনীতিবিদ বলেন, ইংল্যান্ডের পরেই একমাত্র দেশ বাংলাদেশ, যেখানে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। শিক্ষার মানে নজর দিতে হবে। সরকার বিদ্যুতের দিকে নজর দিয়েছে এটা ভালো দিক, তবে সোলারের দিকেও নজর দেওয়া উচিত। পোশাক এগিয়ে যাচ্ছে, গ্রিন টেক্সটাইলের দিকে নজর দেওয়া উচিত। তিনি বলেন, বেসকারি খাতকে এগিয়ে নিতে অবকাঠামো উন্নয়নসহ সরকারে সরাসরি পলিসি সাপোর্ট প্রয়োজন।

 

বিশেষ করে মধ্যম আয়ের পথে হাঁটছে বাংলাদেশÑ এমন তথ্য সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য সুখবরই ছিল বলা চলে। বিশ্বব্যাংক বলছে, নিম্ন আয়ের দেশ থেকে বেরিয়ে এসেছে বাংলাদেশ। দেশটি এখন থেকে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে পরিচিত হবে। প্রতিবছর ১ জুলাই বিশ্বব্যাংক আনুষ্ঠানিকভাবে মাথাপিছু মোট জাতীয় আয় অনুসারে দেশগুলোকে চারটি আয় গ্রুপে ভাগ করে। যাদের মাথাপিছু জাতীয় আয় ১ হাজার ৪৫ ডলার বা তার নিচে, তাদের বলা হয় নিম্ন আয়ের দেশ। স্বাধীনতার পর থেকে এ তালিকাতেই ছিল বাংলাদেশ।

 

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের পরিচালক অর্থনীতিবিদ ড. জামালউদ্দিন আহমেদ বলেন, মধ্যম আয়ের দেশে এগিয়ে নিতে হলে বেসরকারি খাতকে গুরুত্ব দিতে হবে। মধ্যম আয়ের দেশে বড় বাধা বিচারহীনতা। ব্যবসায়িক পরিবেশ তৈরি করতে হবে। কমার্শিয়াল জায়গায় কমার্শিয়াল লোক বসাতে হবে। আমলাদের জনগণের সেবায় আরও মনযোগী হতে হবে। গভর্নেন্সে আরও জোর দিতে হবে। গভর্নেন্সি সহায়তার ফান্ডের যথাযথ ব্যবহার করতে হবে।

 

তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, গত সাত বছরে সরকারের অনেক সফলতা। আরও ভালো করা যেত, কিন্তু পলিসির কারণে সম্ভব হয়নি। জিডিপির গ্রোথ সাড়ে ৭-৮ শতাংশ থাকার কথা ছিল। সেখানে জিডিপি সাড়ে ৬ শতাংশে আটকে আছে।

 

একই সঙ্গে জনশক্তি রফতানিও ছিল সন্তোষজনক। বন্ধ থাকা শ্রমবাজারগুলো একের পর এক খুলতে শুরু করে। প্রচলিত শ্রমবাজারের পাশাপাশি নতুন বাজারেরও সন্ধান পায় বাংলাদেশ। সব মিলিয়ে অপার সম্ভাবনাময় এ খাতে নতুন আশার আলো দেখছেন সরকারসহ জনশক্তি রফতানিকারকেরা। দেশের অন্যতম বৈদেশিক শ্রমবাজার মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রফতানি এখন সময়ের ব্যাপার। সৌদি আরবের বন্ধ দরজা খুলেছে। কাতার, কুয়েতের ক্ষেত্রে ইতিবাচক সাড়া মিলছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) শ্রমশক্তি রফতানি নিয়ে স্বপ্ন দেখা হচ্ছে।

 

অবশ্য বিদায়ী বছরে প্রবাসীদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে ভাটা পড়ে। তিন যুগেরও বেশি সময়ে পর প্রথমবারের মতো ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে। তবে গত ২০১৪-১৫ অর্থবছরে কিছুটা ইতিবাচক হলেও ২০১৫-১৬ অর্থবছরে আবারও ধস নামে প্রবাসী আয়ে।

 

আশার খবর ছিল, মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের ঘর অতিক্রম করেছে। গত সাত অর্থবছর ধরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি বেশ ভালো অবস্থা রয়েছে। সবশেষ ২০১৫-১৬ অর্থবছর শেষে প্রবৃদ্ধি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক শূন্য ১ শতাংশে।

 

এ সরকারের আমলে মাথাপিছু আয় বেড়েছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৬৬ ডলার। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় ছিল ১ হাজার ৩১৪ ডলার। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় ছিল ১ হাজার ১৯০ ডলার।

 

অন্যদিকে, রিজার্ভ চুরির ঘটনা অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা বলেই মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার ডিজিটাল পদ্ধতিতে হ্যাকিংওয়ের মাধ্যমে চুরি করা হয়, যা যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কে গচ্ছিত ছিল। ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের বাংলাদেশ অ্যাকাউন্ট থেকে চুরি হওয়া ১০০ মিলিয়ন ডলার ফিলিপাইনের জুয়ার বাজারে পাওয়া যায়। ওই ঘটনা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক খাতকে বিপর্যস্ত করে তোলে। বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। তবে এরপরেও ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে রিজার্ভ। চলতি বছরের ৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ১৫৪ কোটি ইউএস ডলার।

 

সবশেষ তথ্যানুযায়ী, রিজার্ভের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার।

 

মূল্যস্ফীতি : মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, নভেম্বর মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ। আগের অক্টোবর মাসে এ হার ছিল ৫ দশমিক ৫৭ শতাংশ। নভেম্বর মাসে খাদ্য খাতে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৫ দশমিক ৪১ শতাংশ। আর খাদ্যবহির্ভূত খাতে এ হার ৫ দশমিক ৩৩ শতাংশ।

 

চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছরের (জুলাই-নভেম্বর) প্রথম পাঁচ মাসে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৫ হাজার ২১০ মিলিয়ন ডলার। ২০১৫-১৬ অর্থবছরের একই সময় এসেছিল ৬ হাজার ১৮০ মিলিয়ন ডলার। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে রেমিট্যান্স এসেছে ১৪ হাজার ৯৩০ মিলিয়ন ডলার। ২০১৪-১৫ অর্থবছরের রেমিট্যান্স এসেছে ১৫ হাজার ৩১৬ দশমিক ৯১ মিলিয়ন ডলার।

 

অর্থনীতির বড় জোগান বিদ্যুৎ খাতেও ছিল সুখবর। বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৪ হাজার ৯৪২ মেগাওয়াট থেকে ১৪ হাজার ৫৩৯ মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে। ২০২১ সালের মধ্যে ২৪ হাজার মেগাওয়াট, ২০৩০ সালের মধ্যে ৪০ হাজার মেগাওয়াট এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

 

অর্থনীতিতে সুখকর অবস্থা তৈরির ভিত মজবুত করে চলেছে কৃষি। ফসল উৎপাদন এবং কৃষির বিভিন্ন খাত-উপখাতেও ভালো করেছে বাংলাদেশ। মাছ উৎপাদনে সামগ্রিকভাবে চতুর্থ স্থান অর্জনের সুখবর এসেছে বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) থেকে। ২০২২ সালে মাছ উৎপাদনে যে চারটি দেশ ভালো করবে-সেই সম্ভবনার তালিকাতেও আছে বাংলাদেশের নাম। আর চাল উৎপাদনেও চতুর্থ দেশ। ছিল বিনিয়োগ উপযোগী পুঁজিবাজার। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি বিদেশিরাও বিনিয়োগে সক্রিয় হয়েছেন। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা সংকট কেটেছে।

 

[লেখক: সম্পাদক, বিডিজার্নাল]

Facebook Comments

এ সংক্রান্ত আরো খবর




সম্পাদক: আরিফা রহমান

২৮/এফ ট্রয়োনবী সার্কুলার রোড, ৫ম তলা, মতিঝিল, ঢাকা।
সর্বক্ষণিক যোগাযোগ: ০১৭১১-০২৪২৩৩
ই-মেইল ॥ sangbad24.net@gmail.com
© 2016 allrights reserved to Sangbad24.Net | Desing & Development BY PopularITLtd.Com, Server Manneged BY PopularServer.Com