ads

রবীন্দ্রনাথের বিজ্ঞানচেতনা, ধ্যান ও স্রষ্টাবন্দনা: আল্লামা ড. এম শমশের আলী

ড. এম শমশের আলী

সংবাদ২৪.নেট ডেস্ক:
“রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আমরা যখন কোনো অনুষ্ঠান করি–সে অনুষ্ঠানে গান থাকে, নাচ থাকে, তার রচিত কবিতার আবৃত্তি হয়, বিভিন্ন আলোচনা হয়। সে আলোচনায় কবিগুরুর সাহিত্য ও সংগীতের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। এবং যথার্থই বলা হয় যে,  তিনি ছিলেন সার্বজনীন কবি, গীতি কবি, মরমী কবি, প্রকৃতিপ্রেমিক কবি, আধ্যাত্মিক কবি। কিন্তু অনুষ্ঠানে যা থাকে না, সেটা হচ্ছে তার বিজ্ঞান মানসের কথা ও তার বিশ্বচিন্তার কথা। রবীন্দ্রনাথ নানা দেশে ঘুরেছেন, সেসব দেশে মানুষের জীবনযাত্রার মান ও আয়োজন দেখেছেন। তাদের উন্নয়নে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি যে একটি বড় হাতিয়ার হিসেবে ভূমিকা রেখেছে তা তিনি গভীরভাবে উপলদ্ধি করেছেন। এ সম্পর্কে লিখেছেনও। চীন যে বিজ্ঞানের শক্তি করায়ত্ত করতে পারলে, তারা একদিন বড় শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে– এ ভবিষ্যদ্বাণীও তিনি করেছেন এবং তা আজ অক্ষরে অক্ষরে খেটেও গেছে।

জগৎ-ঘোরা এ মানুষটার যে একটা বিশ্বদর্শন ছিল তা বলাই বাহুল্য। তার এই বিশ্বদর্শন বুঝতে হলে তার বিজ্ঞান মানসকে বুঝতে হবে। আমরা রবীন্দ্রনাথের কবি মানসের কথা বলি, আধ্যাত্মিক মানসের কথা বলি কিন্তু তার বিজ্ঞান মানসের কথা বলি না। এর একটা কারণও রয়েছে। যে-সব কবি-সাহিত্যিকরা রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ও সংগীত নিয়ে চর্চা করেন, বাস্তবে তাদের অধিকাংশই বিজ্ঞান থেকে অনেক দূরে। আবার ওদিকে যারা বিজ্ঞান চর্চা করেন, সাধারণভাবে সাহিত্যের দিকে তাদেরকে খুব একটা ঝুঁকতে দেখা যায় না। তবে মজার কথা হলো এই যে, সাহিত্য যদি সত্যিই মানুষের জীবন, সংস্কৃতি ও পরিবেশের এক শৈল্পিক প্রতিচ্ছবি হয় এবং বিজ্ঞান যদি মানুষের সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়, তবে বিজ্ঞান ও সাহিত্যের মধ্যে অবশ্যই একটা যোগসূত্র থাকা দরকার। এ কথাটাই সাহিত্যিকগণ ও বিজ্ঞানীরা এখনও ঠিক ভালমতো বুঝে উঠতে পারেন নি। গোলমালটা সেখানেই।”

গত ২১ ডিসেম্বর বুধবার কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের একটি অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য ও সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর এমেরিটাস এবং বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী আল্লামা ড. এম শমশের আলী। তিনটি পর্বে রবীন্দ্রনাথের বিজ্ঞানচেতনা, ধ্যান ও স্রষ্টাবন্দনা শীর্ষক বিষয়ে এ বিশেষ আলোচনাটি উপভোগ করেন ফাউন্ডেশনের আড়াই সহস্রাধিক সদস্য। প্রচলিত ধারণাকে ছাপিয়ে এ আলোচনায় শ্রোতারা অনুভব করেন ভিন্ন এক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে, যিনি প্রকৃতই বিজ্ঞানচেতনা, ধ্যান ও স্রষ্টাবন্দনায় উদ্বুদ্ধ একজন বিশ্বমনীষী।

আলোচনার বিভিন্ন পর্বে ড. শমশের আলী আরো বলেন, ‘বিশ্বপ্রভুর ধ্যানে যে মাধুরী তা প্রকাশ পেয়েছে রবীন্দ্রনাথের অসংখ্য গানে। ধ্যানে নিমগ্ন হয়ে কবি যা উপলব্ধি করেছেন, তারই প্রকাশ ঘটেছে গীতাঞ্জলিতে, তার স্রষ্টা বন্দনায়। এই বন্দনায় পরমকে উপলব্ধি করার আকুতিতে একদিকে তিনি নিজের ঘর পরিষ্কার করার কথা বলেছেন, অন্যদিকে তার সকল অহংকার বিনাশের কথা বলেছেন। নিজের ঘরের কথাটাই প্রথমেই বলি। আজ জোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে.. গানটিতে তিনি বলেছেন, আমার এ ঘর বহু যতন ক’রে/ ধুতে হবে মুছতে হবে মোরে। আমারে যে জাগতে হবে,/ কী জানি সে আসবে কবে এই নিরালায় …। এখানে এই ঘর ধোয়ামোছার কাজটি কিন্তু ধ্যানের একটি প্রধান কাজ। আপনারা যখন কোয়ান্টাম মেডিটেশন করেন তখন গুরুজী আপনাদেরকে যে মনের ঘরে প্রবেশ করতে বলেন, সে ঘরটা কিন্তু আত্মোপলব্ধির ঘর, নিজেকে আবিষ্কার করার ঘর। এমনি ঘর তৈরি করে সারাজীবন কবি পরমাত্মার সঙ্গে মিলনের অপেক্ষায় ছিলেন। সেই সাথে কবি নিজের সকল অহঙ্কারকে দূরীভূত করার সাধনা করেছেন প্রতিনিয়ত। স্রষ্টার কাছে তিনি মিনতি করেছেন এই বলে–আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণধুলার তলে/ সকল অহংকার হে আমার ডুবাও চোখের জলে।

এখানে কবি যে কথাগুলো বলেছেন তা কেবলমাত্র বিনয়ের কথা। আর বিনয় ছাড়া বন্দনা হতে পারে না। আমরা যখন মনের ঘরে ঢুকতে চাই তখন কিন্তু বিনয়ের সাথে ঢুকতে হবে, কোলাহল ছেড়ে ঢুকতে হবে, তারপর ধ্যানমগ্ন হতে হবে।

পরিশেষে আল্লামা শমশের আলী বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথকে আমরা যদি খন্ডিত রূপে না দেখে তাকে সামগ্রিকরূপে দেখি তবে তার বিজ্ঞানচেতনা, মানবপ্রেম, প্রকৃতিপ্রেম এবং তার ধ্যান ও তার স্রষ্টাবন্দনা যে-কোনো সংবেদনশীল পাঠকের মনে জীবন সম্পর্কে একটি উচ্চতর ধারণা দিতে সক্ষম হবে। আজকের এই শশব্যস্ত কোলাহলময় জীবনে আমরা যদি প্রতিদিন কিছুক্ষণের জন্য হলেও ধ্যানমগ্ন হয়ে বিশ্বস্রষ্টার বন্দনা বিনয় ও দীনতার সাথে করতে পারি, তবে স্রষ্টাকে আমরা পাব আমাদের সকল শুভ কাজের সঙ্গী হিসেবে, দিশারী হিসেবে এবং সেটাই হবে আমাদের সবচেয়ে বড় পাওয়া।’

Facebook Comments

এ সংক্রান্ত আরো খবর




সম্পাদক: আরিফা রহমান

২৮/এফ ট্রয়োনবী সার্কুলার রোড, ৫ম তলা, মতিঝিল, ঢাকা।
সর্বক্ষণিক যোগাযোগ: ০১৭১১-০২৪২৩৩
ই-মেইল ॥ sangbad24.net@gmail.com
© 2016 allrights reserved to Sangbad24.Net | Desing & Development BY PopularITLtd.Com, Server Manneged BY PopularServer.Com