ads

ইসলামের দৃষ্টিতে প্রচলিত আকর্ষণীয় বাচনভঙ্গির ওয়াজ-মাহফিল

ওয়াজ-মাহফিল

সংবাদ২৪.নেট ডেস্ক:

প্রশ্ন : সুন্দর কণ্ঠস্বর ও আকর্ষণীয় বাচনভঙ্গির অধিকারী অল্প বয়সের বালক দ্বারা ওয়াজ করানোর বিধান কী?

উত্তর : ওয়াজ ইসলাম ধর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারমূলক কাজ। এটি রঙ্গতামাশার বস্তু নয়।
অযোগ্য ব্যক্তির হাতে সমাজসংস্কারের কাজ সোপর্দ করা মহানবী (সা.)-এর ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী কেয়ামতের নিদর্শন। ওয়ায়েজ আলেম, জ্ঞানী, দ্বীনদার, মুত্তাকি ইত্যাদি গুণে গুণান্বিত হওয়া আবশ্যক। তাই নাবালক বা পেশাদার ওয়ায়েজ থেকে বিরত থাকা জরুরি। এ বিষয়ে ‘ফাতাওয়া রাহমানিয়া’য় এসেছে : ওয়ায়েজ বা ধর্মীয় বক্তা হওয়ার জন্য প্রথম শর্ত হলো আলেম হওয়া…। যে ব্যক্তি আলেম নয়, আরবি ও ফারসিও সে নিয়ম অনুযায়ী পাঠ করেনি, তাফসির, হাদিস, ফিকাহশাস্ত্রের নিয়মনীতি-মূলনীতি সম্পর্কে অবগত নয়, তাকে ওয়ায়েজ বলা যাবে না। ’ (ফাতাওয়া রহিমিয়া : ২/৩৬৪)

ইসলামী আইনবিষয়ক বিশ্বকোষ ‘আল মাওসুআতুল ফিকহিয়্যা আল কুয়েতিয়্যা’ নামক গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে : ‘ওয়ায়েজ হওয়ার জন্য কয়েকটি শর্ত আছে। এক. ওয়ায়েজ ব্যক্তি বিবেকবান ও বালেগ হওয়া। দুই. ন্যায়পরায়ণ হওয়া। তিন. হাদিসের শব্দ, অর্থ, ব্যাখ্যা, বিশুদ্ধতা ও অশুদ্ধতা বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান থাকা। চার. কোরআনের তাফসিরকারক হওয়া। কোরআনের কঠিন থেকে কঠিন বিষয়গুলো সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা থাকা। আগের তাফসিরবিদদের ব্যাখ্যা সম্পর্কে জ্ঞান থাকা। ’ (আল মাওসুআতুল ফিকহিয়্যাহ আল কুয়েতিয়্যা : ৪৪/৮১)

প্রশ্ন : বিনিময় নির্ধারণ করে ওয়াজ করা কি বৈধ? যেমন ‘এত টাকা দিলে ওয়াজ করব, নয়তো করব না’—এভাবে ওয়াজ করা কি বৈধ? ওই টাকা কি হালাল হবে?

উত্তর : আগের যুগে আলেমদের ভরণপোষণ ছিল রাষ্ট্রের অধীনে। সে সময় তাঁদের জন্য অন্যের থেকে অর্থ গ্রহণ বৈধ ছিল না। পরবর্তী যুগের ইসলামী পণ্ডিতরা কিছু কিছু দ্বীনি কাজের বিনিময় দেওয়া-নেওয়া জায়েজ বলেছেন। অনেক আলেম ওয়াজকেও ওই সব কাজের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। কিন্তু ‘এত টাকা দিতে হবে, অন্যথায় ওয়াজ করব না’—এভাবে বলা উচিত নয়। তবে হ্যাঁ, এ অবস্থায়ও টাকা নেওয়া অবৈধ হবে না। কিন্তু এভাবে চুক্তি করে টাকা নিয়ে এমন কথা ভাবনা করা বা বলা ঠিক হবে না যে ‘আমি ওয়াজ করছি মানুষের হেদায়েতের জন্য। ’

এ বিষয়ে ‘দুররুল মুখতার’ নামক কিতাবে এসেছে : ‘বর্তমানে কোরআন শেখানো, ফিকহ চর্চা, ইমামতি, আজান ইত্যাদির বিনিময় গ্রহণের ব্যাপারে বৈধতার ফতোয়া দেওয়া হয়। কেউ কেউ আজান, ইকামত ও ওয়াজকেও এর অন্তর্ভুক্ত করেছেন। ’ (আদ দুররুল মুখতার : ৬/৫৫)

প্রশ্ন : আমাদের দেশে প্রচলিত রাতের ওয়াজ কতটুকু বৈধ?

উত্তর : রাতে দ্বীনি নসিহত মানুষের ঘুমের বা রোগীর ক্ষতি না হওয়ার শর্তে জায়েজ। তবে প্রচলিত ওয়াজে তা উপেক্ষা করা হয়। রাত জেগে ওয়াজ শুনে ফজরের নামাজ কাজা করার প্রবণতাও অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়। তাই এ নিয়ম অবশ্যই পরিবর্তন করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে রদ্দুল মুহতার নামক কিতাবে এসেছে : ‘এশার নামাজের আগে ঘুমানো এবং এর পরে কথা বলা হাদিস শরিফে নিষেধ করা হয়েছে। অন্য হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, এশার পর কোনো কাজ নেই। কিন্তু মুসল্লির জন্য নামাজ আদায় আর মুসাফিরের জন্য সফর করা বৈধ। ’ (রদ্দুল মুহতার : ১/৩৬৮)

প্রশ্ন : মসজিদে এশার নামাজের পর উচ্চ আওয়াজে তাফসির করা ও মুসল্লিদের দিয়ে জোরে ‘সুবহানাল্লাহ’ বলানো কি জায়েজ? অথচ এর দ্বারা মসজিদে নামাজরত অন্য মুসল্লিদের নামাজে ব্যাঘাত হয়।

উত্তর : মসজিদ ইবাদতের স্থান। মসজিদে নামাজ, তিলাওয়াত, জিকির ও তাফসির ইত্যাদি উচ্চ স্বরে করা জায়েজ আছে। তবে শর্ত হলো, নামাজ ছাড়া অন্যান্য ইবাদত এমনভাবে আদায় করতে হবে, যাতে ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নতে মুয়াক্কাদা আদায়কারীর ক্ষতি না হয়। অন্যথায় গুনাহগার হবে। এ বিষয়ে ফাতাওয়া হাক্কানিয়াতে এসেছে : ‘মসজিদে উঁচু আওয়াজে ওয়াজ করা ও গজল পরিবেশন করা বৈধ, যদি এর মাধ্যমে কোনো নামাজির নামাজের ক্ষতি না হয়। ’ (ফাতাওয়া হাক্কানিয়া : ৫/৯৩)

প্রশ্ন : যেসব মাহফিলে আয়োজকদের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে ভিডিও ধারণের ব্যবস্থা করা হয়, সেসব মাহফিলে অংশগ্রহণ করা যাবে কি?

উত্তর : যেসব মাহফিলে শরিয়তবিরোধী কর্মকাণ্ড চলে, সেসব মাহফিলে অংশগ্রহণ করা জায়েজ নয়। ভিডিও ধারণও ইসলামের দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ। তাই প্রশ্নে বর্ণিত মাহফিলে অংশগ্রহণের অনুমতি নেই। এ বিষয়ে রদ্দুল মুহতার নামক গ্রন্থে এসেছে : ‘মুসলিম শরিফের ব্যাখ্যাগ্রন্থে ইমাম নববীর কথা থেকে এটা স্পষ্ট যে প্রাণীর ছবি ধারণ করা নিষিদ্ধ হওয়ার বিষয়ে মুসলিম উম্মাহর ঐকমত্য সিদ্ধান্ত আছে। ’ (রদ্দুল মুহতার : ১/৬৪৭)

প্রশ্ন : দাড়ি মুণ্ডনকারী ব্যক্তিকে টাকা চাঁদা দেওয়ার শর্তে মাহফিল কমিটির সদস্য বানানো কি বৈধ? এভাবে শর্ত করে চাঁদা নেওয়া যাবে কি?

উত্তর : যদি কেউ কোনো ধর্মীয় কল্যাণমূলক কাজে সম্পূর্ণ সন্তুষ্টচিত্তে খালেস সওয়াবের নিয়তে হালাল উপার্জন থেকে চাঁদা দেয়, তাহলে তা নেওয়া বৈধ। পক্ষান্তরে কাউকে বাধ্য করে বা লজ্জিত করার মাধ্যমে বা পদের শর্ত আরোপ করে ও লোভ দেখানোর মাধ্যমে চাঁদা উসুল করা জায়েজ নেই। ধর্মীয় কাজের কোনো কমিটিতে দাড়ি মুণ্ডানো ব্যক্তিকে সদস্য বানানো বৈধ হবে না। এ বিষয়ে ফাতাওয়া রহিমিয়ায় এসেছে : ‘ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়ায় উল্লেখ করা হয়েছে যে নেককার মানুষ উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও ফাসেক ও প্রকাশ্যে পাপকাজকারীকে ধর্মীয় কর্তৃত্ব দেওয়া অবৈধ। ’ (ফাতাওয়া রহিমিয়া : ২/১৬৪)

লেখক : মাওলানা সাখাওয়াত উল্লাহ
 শিক্ষক, মাদ্রাসাতুল মদিনা নবাবপুর, ঢাকা

Facebook Comments

এ সংক্রান্ত আরো খবর




সম্পাদক: আরিফা রহমান

২৮/এফ ট্রয়োনবী সার্কুলার রোড, ৫ম তলা, মতিঝিল, ঢাকা।
সর্বক্ষণিক যোগাযোগ: ০১৭১১-০২৪২৩৩
ই-মেইল ॥ sangbad24.net@gmail.com
© 2016 allrights reserved to Sangbad24.Net | Desing & Development BY Popular-IT.Com, Server Manneged BY PopularServer.Com