ads

আ’ লীগের নেতার বিবৃতির বিরুদ্ধে ক্ষোভে বিক্ষোভে ফুসছে হিন্দু সম্প্রদায়

সিদ্দিকুর রহমান

সংবাদ২৪.নেট ডেস্ক: আওয়ামী লীগ নেতার বিবৃতির বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফেটে পড়েছে হিন্দু সম্প্রদায়। বক্তৃতা-বিবৃতি, সাংবাদিক সম্মেলন ও সামাজিক মাধ্যমে তারা প্রতিবাদ জানাচ্ছে হিন্দু সম্প্রদায়ের সংশ্লিষ্ট নেতৃবৃন্দ। বিবৃতিদাতা ওই আওয়ামী লীগ নেতা যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সভাপতি ড. সিদ্দিকুর রহমান।

 

সম্প্রতি তার দেয়া এক বিবৃতির বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফেটে পড়েছে প্রবাসের হিন্দু সম্প্রদায়।

 

তারা বলেছেন, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর যে হামলা-নির্য়াতন চলছে তার প্রতিবাদে প্রবাসে অনুষ্ঠিত সংখ্যালঘুদের আন্দোলন কোনভাবেই দেশ বা সরকারবিরোধী নয়। ড. সিদ্দিকুর রহমানকে ব্যক্তিগতভাবে সমালোচনা করে তারা বলেছেন, তার মতো নব্য আওয়ামী লীগাররা যারা এখনও জামায়াত-বিএনপির সাথে গাঁটছড়া কাটিয়ে উঠতে পারেনি তাদের পক্ষে হিন্দু সম্প্রদায়ের কোন ব্যক্তিরই দেশপ্রেম নিয়ে কটাক্ষ করার অধিকার নেই।

 

তারা বলেছেন, ২০০১ সালেও হিন্দুরা তাদের অধিকার রক্ষার জন্য আন্দোলন করেছে তখন আওয়ামী লীগ এর সঙ্গে একাত্ম ছিল। সেই আন্দোলনের সুফল আওয়ামী লীগ ভোগ করেছে। তখন সংখ্যালঘুদের আন্দোলন দেশবিরোধী না হয়ে থাকলে এখন হবে কেন।

 
হিন্দু সম্প্রদায়ের এইসব অভিযোগ সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে কোন প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তাদের কেউ মুখ খুলছেন না। তবে আওয়ামী লীগের ভেতরের একটি দায়িত্বশীল সূত্রে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ হিন্দু সম্প্রদায়ের তৎপরতা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

 

 

ড. সিদ্দিকুর রহমানের বিবৃতির প্রতিবাদে পূজা পুনর্মিলনী পরিষদ আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, এই বিবৃতির মাধ্যমে সিদ্দিকুর রহমান সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও আওয়ামী লীগকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। এর পরিণতি ভয়াবহ হওয়া নিতান্ত স্বাভাবিক। আমরা চাই না কোন অশান্তি কিংবা কোন ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হোক। কিন্তু যদি তেমন কিছু ঘটে তবে তার জন্য সিদ্দিকুর রহমান ও তার সহযোগীরাই দায়ী থাকবেন।

 

 

সাংবাদিক সম্মেলনের বক্তব্যে আরো বলা হয়, পাকিস্তান আমলে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার পর থেকে অদ্যাবধি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ আওয়ামী লীগকে সমর্থন জানিয়ে আসছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায় আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক হিসাবে আখ্যায়িত হয়েছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও আওয়ামী লীগকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়ার কারণে তারা ড. সিদ্দিকের পদত্যাগ দাবী করেন।

 

গত ১৯ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় জ্যাকসন হাইটসের ইত্যাদি পার্টি সেন্টারে অনুষ্ঠিত এই সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন ঐক্য পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক নবেন্দু বিকাশ দত্ত। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন শিতাংশু গুহ। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন পূজা পুনর্মিলনী পরিষদর সভাপতি শ্যামল কর ও বক্তব্য রাখেন ভজন সরকার। উপস্থিত ছিলেন সুব্রত বিশ্বাস, সুশীল সাহা, রবীন্দ্র সরকার, কুমার বাবুল সাহা, সুভাষ পাল, অভিনাষ আচার্য্য প্রমুখ।

 

লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ‘আমরা আমাদের অধিকার আদায়ে আন্দোলন করছি। বাংলাদেশে ধারাবাহিকভাবে মৌলবাদী গোষ্ঠী এবং সরকারের অভ্যন্তরে ঘাপটি মেরে থাকা কিছু সংখ্যক সাম্প্রদায়িক স্বার্থবাদী চক্র সংখ্যালঘু, আদিবাসী ও সাঁওতালদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন-উচ্ছেদ-জবরদখল এমনকি দেশ থেকে তাদের তাড়িয়ে দেবার ঘটনা ঘটিয়ে চলেছে। দেশে ও প্রবাসে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় সভা-সমাবেশের মাধ্যমে তার প্রতিবাদ ও সুষ্ঠু বিচারের দাবি জানিয়ে আসছে। তারই অংশ হিসেবে নিউইয়র্ক প্রবাসী সংখ্যালঘু সম্প্রদায় কয়েকটি প্রতিবাদ সমাবেশ করে।

 

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ সভপতি ড. সিদ্দিকুর রহমান পত্রপত্রিকা ও সামাজিক মাধ্যমে এসব সমাবেশের প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তিনি সংখ্যালঘুদের এ সমাবেশকে বাংলাদেশ বিরোধী কিছু সংখ্যক সংখ্যালঘুদের চক্রান্ত বলে অভিযোগ করেছেন। একই সাথে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে সংখ্যালঘুদের আন্তরিকতা ও দেশাত্ববোধ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।’

 

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ‘মৌলবাদী গোষ্ঠী ও সরকারের ভেতর থেকে এক শ্রেণীর সাম্প্রদায়িক চক্র বর্তমান সরকারকে অস্থিতিশীল করে তুলতে সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার নির্যাতনে লিপ্ত রয়েছে। সরকারও মাঝে মধ্যে এসব চক্রের চক্রান্তের কথা বলে থাকেন। তাই সিদ্দিকুর রহমান কোন দৃষ্টিতে আমাদের এ সমাবেশকে দেশবিরোধী আখ্যায়িত করেন? আমাদের আশঙ্কা তিনিও ঐ চক্রের হয়ে প্রতিবাদে অবতীর্ণ হয়েছেন কিনা? কারণ অতীতে দলের অভ্যন্তর থেকেও তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উঠতে দেখা গেছে।

 

এমনকি প্রখ্যাত লেখক সাংবাদিক আব্দুল গাফফার চৌধুরীকে নিয়ে মৌলবাদী চক্রের বিরুদ্ধে নিউইয়র্কের আওয়ামী লীগ প্রতিবাদ করলেও সিদ্দিকুর রহমান তখন তার একটি গ্রুপ নিয়ে মৌলবাদীদের পক্ষাবলম্বন করতে দেখা গেছে। পত্রপত্রিকায় এ নিয়ে অনেক লেখালেখিও হয়েছে।

 

’৯১/৯২ সালে খালেদা জিয়া নিউইয়র্ক এলে স্বাধীনতার পক্ষ শক্তি যখন প্রতিবাদ জানায় তখন তিনি খালেদা জিয়ার সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। আরো অভিযোগ শোনা যায়, লতিফ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠেছিল তার রেকর্ডটিও তিনিই মিডিয়াকে সরবরাহ করেছিলেন।’

 

বক্তব্যে আরো বলা হয়, দেশে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া ঘটনার কোন প্রতিকার আমরা লক্ষ্য করি না। একের পর এক এসব ঘটনার কোন বিচার হয় না এবং হচ্ছে না। ব্রাহ্মবাড়িয়ার নাসিরনগরে সংখ্যালঘুদের ওপর এবং গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতালদের ওপর নৃশংস আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে। নাসিরনগরের ঘটনা সরকার ও প্রশাসনের নজরে আসার পরও তিন তিনবার ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। ঘটনার চারদিন পর স্থানীয় সাংসদ ও মৎস্যমন্ত্রী এলাকায় গেছেন। তার যাওয়াতে অত্যাচারিত সংখ্যালঘুরা আশ্বস্ত হয়েছিল। কিন্তু ‘মালাউনের’ বাচ্চারা বাড়াবাড়ি করছে বলে তিনি ঘটনাকে আরো উস্কে দেন।

 

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সমগ্র দেশে সংখ্যালঘুরা শান্তিতেই আছেন। পুলিশ বলছে, রসরাজ নির্দোষ অথচ আজও তাকে জেল খাটতে হচ্ছে। নিন্মস্তরের তিনজন দলীয় কর্মীর ওপর দোষ চাপিয়ে মূল অপরাধীদের ধরাছোঁয়ার বাইরে রেখে দেয়া হয়েছে। গোবিন্দগঞ্জেও অনুরূপ ঘটনা ঘটলো। কোন প্রকার আপস মীমাংসায় না গিয়ে নিরীহ সাঁওতালদের ওপর একাত্তরের কায়দায় আক্রমণ করা হলো।

 

উপর্যপুরি গুলি চালানো হয় নিরীহ নিরস্ত্র সাঁওতালদের ওপর। চারজন নিহত হন। আহত হন অনেকে। সাঁওতালদের অভিযোগ, তাদের অনেকে এখনও নিখোঁজ রয়েছে। গুরুতর আহতদের হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে বেডের সাথে বেঁধে রেখে। সেই অমানবিক বাঁধন মুক্ত করতে হয়েছে হাইকোর্টের নির্দেশে। গরিব সাঁওতালদের দুই শতেরও ওপর ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হয়। দুই হাজারের ওপর সাঁওতালদের উচ্ছেদ ও নিঃস্ব করে রাস্তায় বসিয়ে দেয়া হয়েছে। ঘটনার সাথে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও পুলিশ জড়িত বলে মানবাধিকার সংগঠন, রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতাকর্মী এবং টিভি ও সাংবাদিকদের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে। সাঁওতালরাও একই অভিযোগ তুলেছেন। সর্বশেষ একটি টিভি ফুটেজে পুলিশই ঘরে আগুন দিয়েছে এই অভিযোগের ভিত্তিতে হাইকোর্ট বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। ঘটনা কত অমানবিক ও নৃশংস হলে দেশের প্রধান বিচারপতি বিচার বিভাগের পক্ষ থেকে রেজিস্টারের নেতৃত্বে তাদেরকে সাহায্য পাঠাতে হয়।

 

সংবাদ সম্মেলনে আরো বলা হয়, ‘বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর একটি কমিশন সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের ঘটনার তদন্ত করে। তদন্তের পর ২০ হাজার ঘটনা উঠে আসে। তার মধ্য থেকে কমিশন ৫ হাজার ঘটনা জরুরী ভিত্তিতে বিচারের সুপারিশ করে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও সুশীল সমাজের দাবি সত্ত্বেও আজ পর্যন্ত একটি ঘটনারও বিচার হয়নি।’

 

বিচারহীনতার পরিণতিতেই বার বার সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার নির্যাতন ও উচ্ছেদের ঘটনা ঘটছে মন্তব্য করে বলা হয়, ‘আমাদের সমাবেশ কোন ভাবেই দেশ কিংবা সরকারের বিরুদ্ধে নয়। কারণ আমরাও এদেশের নাগরিক। সরকারের হাতকে শক্তিশালী করতে মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধেই আমাদের এ আন্দোলন সমাবেশ।’

 

এদিকে, হিন্দু অধিকার কর্মী পরিচয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জগন্নাথ হল শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শ্যামল চক্রবর্তী এক বিবৃতিতে হিন্দু সম্প্রদায় নেতা শিতাংশু গুহের বিরুদ্ধে ড. সিদ্দিকুর রহমানের বিবৃতির সমালোচনা করে তার বক্তব্যকে অশালীন, চরম ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও হুমকিস্বরূপ বলে অভিহিত করেছেন।

 

তিনি বলেন, হিন্দুরা কোন ব্যক্তি বা দলের গৃহপালিত নাগরিক নয় যে তারা যেভাবে শিখিয়ে দেবে সেইভাবেই কথা বলবে আবার যখন ইশারা দেবে তখনই থেমে যেতে হবে।

 

তিনি বলেন, আজ আওয়ামী-বিএনপি-জামায়াতের যোগসাজশে সারাদেশে হিন্দুদের ওপর সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস ও আক্রমণ চালানো হচ্ছে। বাংলাদেশকে ইসলামী রাষ্ট্র বানানোর লক্ষ্যে হিন্দুদেরকে দেশ ত্যাগে বাধ্য করা হচ্ছে। ক্ষমতার রাজনীতিতে একে অপরের প্রতিপক্ষ হলেও নৈতিকভাবে বাংলাদেশের প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলই পুরোপুরি দেউলিয়া এবং আপাদমস্তক সাম্প্রদায়িক। হিন্দুদের নির্যাতনের ব্যাপারে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামায়াত এখন এককাট্টা।

 

তিনি বলেন, দেশের সরকারের কাছে বিচার চেয়ে ব্যর্থ হয়ে হিন্দুরা বিশ্ব সংস্থা ও বিদেশী সরকারের কাছে আর্জি জানালে তাদেরকে উগ্র হিন্দু বা দেশদ্রোহী আখ্যা দিয়ে হুমকি-ধামকি দেয়া হয়।

 

শ্যামল চক্রবর্তী তার বিবৃতিতে বলেন, এই রাজাকার-নব্য রাজাকাররা হয়তো ভুলে গেছে হিন্দুরা বীরের জাতি। আবহমানকাল ধরে বাংলাদেশ হিন্দুদেরই দেশ ছিল, হিন্দুরাই এই দেশের আদিবাসী। হিন্দুদের রক্ত ও জীবনের বিনিময়েই এই দেশ স্বাধীন হয়েছে।

 

তিনি বলেন, দেশে হিন্দু সংস্কৃতি যতদিন ছিল ততদিনই বাংলাদেশ সুজলা-সুফলা ও সমৃদ্ধশালী একটি দেশ ছিল। আজ এই বাংলার এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত চষে বেড়ায় শত শত মৌলবাদী গোষ্ঠী।

 

তিনি বলেন, হিন্দুরা শান্তিপ্রিয় জাতি বলে বারবার মৌলবাদীদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে, শাসিত ও শোষিত হয়েছে। আবার তারা নিজেদের ভূমিকে স্বাধীন করেছে। প্রয়োজনে আবারও হিন্দুরা স্বাধীনতার যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়বে বলে মন্তব্য করেন শ্যামল চক্রবর্তী।

Facebook Comments

এ সংক্রান্ত আরো খবর




সম্পাদক: আরিফা রহমান

২৮/এফ ট্রয়োনবী সার্কুলার রোড, ৫ম তলা, মতিঝিল, ঢাকা।
সর্বক্ষণিক যোগাযোগ: ০১৭১১-০২৪২৩৩
ই-মেইল ॥ sangbad24.net@gmail.com
© 2016 allrights reserved to Sangbad24.Net | Desing & Development BY Popular-IT.Com, Server Manneged BY PopularServer.Com