ads

প্রকৃত সাংবাদিক দরকার, হলুদ সাংবাদিক নয়

ইয়াছিন আরাফাত রুবেল

ইয়াছিন আরাফাত রুবেল

হলুদ সাংবাদিকতা : হলুদ সাংবাদিকতা বলতে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে ভিত্তিহীন রোমাঞ্চকর সংবাদ পরিবেশন বা উপস্থাপনকে বোঝায়। এ ধরনের সাংবাতিকতায় ভালমত গবেষণা বা খোঁজ-খবর না করেই দৃষ্টিগ্রাহী ও নজরকাড়া শিরোনাম দিয়ে সংবাদ পরিবেশন করা হয়। হলুদ সাংবাদিকতার মূল উদ্দেশ্য হল সাংবাদিকতার রীতিনীতি না মেনে যেভাবেই হোক পত্রিকার কাটতি বাড়ানো বা টেলিভিশন চ্যানেলের দর্শকসংখ্যা বাড়ানো। অর্থাৎ হলুদ সাংবাদিকতা মানেই ভিত্তিহীন সংবাদ পরিবেশন, দৃষ্টি আকৰ্ষণকারী শিরোনাম ব্যবহার করা, সাধারণ ঘটনাকে একটি সাংঘাতিক ঘটনা বলে প্ৰতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা, কেলেংকারির খবর গুরুত্ব সহকারে প্ৰচার করা, অহেতুক চমক সৃষ্টি ইত্যাদি।

হলুদ সাংবাদিকতার জন্ম: “হলুদ সংবাদিকতা” বিষয়ক কার্টুন; স্প্যানিশ-আমেরিকান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে জোসেফ পুলিৎজার আর উইলিয়াম রুডলফ হার্স্টের মধ্যে দ্বন্দ্ব চরমে উঠে হলুদ সাংবাদিকতার জন্ম হয়েছিল সাংবাদিকতা জগতের অন্যতম দুই ব্যক্তিত্ব যুক্তরাষ্ট্রের জোসেফ পুলিৎজার আর উইলিয়াম রুডলফ হার্স্টের মধ্যে পেশাগত প্রতিযোগিতার ফল হিসেবে। এই দুই সম্পাদক তাদের নিজ নিজ পত্রিকার ব্যবসায়িক স্বার্থে একে অপরের অপেক্ষাকৃত যোগ্য সাংবাদিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত কর্মচারীদের অধিক বেতনে নিজেদের প্রতিষ্ঠানে নিয়ে আসার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছিলেন। এক পর্যায়ে ব্যক্তিগত কেলেংকারির চাঞ্চল্যকর খবর ছেপে তারা পত্রিকার কাটতি বাড়ানোর চেষ্টা করেন। পুলিৎজারের নিউ ইয়র্ক ওয়ার্ল্ড ও হার্স্টের নিউ ইয়র্ক জার্নালের মধ্যে পরস্পর প্রতিযোগিতা এমন এক অরুচিকর পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে, সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতার পরিবর্তে পত্রিকার বাহ্যিক চাকচিক্য আর পাঠকদের উত্তেজনা দানই তাদের নিকট মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়।

আমাদের দেশে হলুদ সাংবাদিকতাঃ নৈতিকতা বলে সাংবাদিকতায় একটি বিষয় আছে যা না থাকলে সাংবাদিকতা আর সাংবাদিকতা থাকে না। সেই নৈতিকতা এ পেশায় এখন বিরল। কিছুদিন আগে আমরা দেখেছি, একটি ‘বিখ্যাত’ নিউজপোর্টাল টানা কয়েকদিন নিউজ করল, প্রাণ ব্র্যান্ডের পণ্য নাকি ভেজালে ভরপুর। হঠাৎ একদিন দেখা গেল, তারা নিউজ করেছে, ‘প্রাণের পণ্য একদম খাঁটি পণ্য। সাথে বিজ্ঞাপনও দেখা গেল সাইটটিতে। কোনো পাঠকের বুঝতে বাকি রইল না এর নেপথ্যের বিষয়টি আসলে কী। একই পোর্টাল ‘ক্ষ’ নামের একটি ব্যান্ডের জাতীয় সংগীত গাওয়া নিয়ে নিউজ করল, জাতীয় সঙ্গীতকে নাকি ব্যান্ডদলটি অপমান করেছে। এটা দেশদ্রোহিতার সামিল। দুদিন পর সোশ্যাল মিডিয়ায় যখন ব্যান্ডদলটির পক্ষেই সবাই বলতে থাকল, তখন তারা উল্টো নিউজ করল, দুর্দান্ত গেয়েছে ‘ক্ষ’। দেশপ্রেম জাগ্রত হবে নতুন করে। তারা শিল্পীদের লাইভ অনুষ্ঠানেও আমন্ত্রণ জানালো। এভাবে কার্যত তারা বড় একটি ক্ষতি করল সংবাদমাধ্যমের। আর সেটি হলো, পাঠকের কাছে মিডিয়ার ক্রেডিবিলিটি বা বিশ্বাসযোগ্যতার। সংবাদমাধ্যমের প্রতি মানুষের এমনিতেই বিশ্বাস বড় দুর্বল। সংবাদমাধ্যমের এমন আচার প্রকাশ পেলে সুদূরপ্রসারী এ ক্ষতির দায় কিন্তু তখন পাঠকের ঘাড়েই যাবে না, যাবে মিডিয়ার ঘাড়েও।

ইদানীং গুগল সার্চ করলে অসংখ্য দেশীয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল চলে আসে। এগুলোর আধেয় ঘেঁটে দেখলে তাজ্জব হতে হয়। এরা লাইম লাইটে আসার জন্য ইচ্ছে করে এমনভাবে নিউজের শিরোনামগুলো করছে যে, ধাক্কা না খেয়ে উপায় থাকে না। শীর্ষস্থানীয় একটি পোর্টাল সেদিন শিরোনাম করল : ‘খালেদার সাথে বেবী নাজনীন, এ কেমন সম্পর্ক’—এ ধরনের। বিস্তারিত নিউজে গিয়ে দেখা গেল, ‘বেগম খালেদা জিয়ার সফর সঙ্গী হচ্ছেন বেবী নাজনীন।‘ বুঝুন অবস্থা। অনলাইন অপর এক পোর্টালের শিরোনাম, “কাজী নজরুলকে পিটালেন জগন্নাথ”। হেডিং দেখে মনে হতে পারে ঢাকার তৎকালীন জমিদার জগন্নাথ রায়চৌধুরী আর বিদ্রোহী কবি নজরুলের মধ্যে হাতাহাতি। নিউজের ভেতরে ঢুকে দেখা গেলো, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় ছাত্র, কাজী নজরুল ইসলাম কলেজের কয়েকজনকে পিটিয়েছে। এমনই আরেকটি শিরোনাম দিল একটি পোর্টাল, “আইয়ুব বাচ্চু আর নেই”। ডিটেইল নিউজ- ‘এই ঈদে আইয়ুব বাচ্চুর ক্যাসেট ‘নেই’। এটা কেমন তরো সাংবাদিকতা? কোথায় যাচ্ছি আমরা?

সংবাদমাধ্যম আজ বড় পুঁজির বড় শিল্প । রাশি রাশি টাকা ছাড়া কোনো মিডিয়া বা সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। তবে পুঁজির পুজাতেই যদি সাংবাদিকতা নিয়ন্ত্রিত হয় তাহলে তা হয় দূর্ভাগ্যজনক। ব্যবসা বা তেজারতি সংবাদমাধ্যমের মূল লক্ষ্য হলে সাংবাদিকতা বৃন্তচ্যুত, লক্ষ্যচ্যুত হয়। এ প্রবণতা সৎ সাংবাদিকতার আরও এক প্রতিপক্ষ। সংবাদপত্র বা সংবাদমাধ্যম তথ্য সরবরাহে মানুষকে ঘটনা ‘এন্টারটেইন’ করে, ‘ইনফর্ম’ করে, ‘এডুকেট’ করে, কিন্তু ব্যবসার স্বার্থে ‘এন্টারটেইনমেন্ট’-এর লক্ষ নির্দিষ্ট হলে তা হয় দূর্ভাগ্যজনক।

সাংবাদিকতা সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করে, সামাজিক দায়বদ্ধতা, মানবাধিকার সংরক্ষণ, অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধাচারণ, দুর্বল জনগোষ্ঠির পক্ষধারণসহ নৈতিকতার ভিত্তি আছে বলে এ পেশা সমাজকে এগিয়ে নেয়, অনুপ্রাণিত করে। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায় দেশগুলোতে মানুষে মানুষে, গোত্রে গোত্রে, বর্ণে বর্ণে, ধর্মে ধর্মে বিভেদকারীর সংখ্যা নগন্য নয়। কারও কারও কাছে এ বিভেদ তেজারতি বা রাজনীতি। এ বিভেদ কখনো ইতিহাস আশ্রিত, কখনো ভূখন্ডগত, ধর্মগত কখনো আবার লিঙ্গ ও ভাষাগত । ‘আমরা’ এবং ‘ওরা’ দূর্ভাগ্যক্রমে এটিই কারও কারও দৃষ্টিভঙ্গি ! অথচ কে না জানি, এ বিভেদ যতো বাড়ে ততোই ব্যক্তিক, সামাজিক, রাষ্ট্রিক প্রগতি বিনষ্ট হয়, মানবতা ততোই প্রার্থীত প্রগতি থেকে পিছিয়ে পড়ে।

আমার বিশ্বাস, বস্তুনিষ্ঠ শান্তিবাদী সাংবাদিকতা এ প্রেক্ষাপটে যোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ নৈতিকতা সম্পন্ন বলিষ্ঠ সাংবাদিকতা একদিকে যেমন বিশ্বাসযোগ্য তথ্য সরবরাহ করে, অন্যদিকে তা কেবল নেতিবাচক বিষয়েই সীমাবদ্ধ থাকেনা, থাকতে হয় তাকে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এবং নিরপেক্ষ পর্যালোচনায় সমাজকে শিক্ষিত ও দায়িত্ববান করার দায়িত্বেও। অন্যসব পেশা থেকে সাংবাদিকতার পার্থক্য এখানেই। বস্তুনিষ্ঠতা, যা সত্য তাই সুন্দর ।

Facebook Comments

এ সংক্রান্ত আরো খবর




সম্পাদক: আরিফা রহমান

২৮/এফ ট্রয়োনবী সার্কুলার রোড, ৫ম তলা, মতিঝিল, ঢাকা।
সর্বক্ষণিক যোগাযোগ: ০১৭১১-০২৪২৩৩
ই-মেইল ॥ sangbad24.net@gmail.com
© 2016 allrights reserved to Sangbad24.Net | Desing & Development BY Popular-IT.Com, Server Manneged BY PopularServer.Com