ads

এই মেয়েকে আমি চিনি ও’ খুব সেনসিটিভ!

মিলি সুলতানা

মিলি সুলতানা

গত কিছুদিন থেকে নিউ ইয়র্কে ঠাণ্ডা একেবারে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। বিকেল সাড়ে চারটে বাজলে চারদিকে ঝুপ করে অন্ধকার নেমে আসে। রাস্তার অত্যাধুনিক বাতির ঝলকে তাল মিলিয়ে কুয়াশারা স্বপ্নজাল বোনে। গাছের পাতা ঝরে সব গাছ ন্যাড়া হয়ে গেছে। প্রকৃতির লাবণ্য শেষ। দুপুরের খাবার খেয়ে ওঠার পর খুব আলসেমি পেয়ে বসে। একটা শর্ট ন্যাপ নেওয়া লাগেই। গায়ের উপর কুইল্ট টেনে বিছানায় শুয়ে পড়লাম বুদ্ধদেব গুহ’র ‘বাবলি’ বইটি নিয়ে। কয়েক পাতা পড়ার পর ঘুমে চোখের পাতা ভারি হয়ে এল। সম্ভবত বিশ পঁচিশ মিনিট বিশ্রাম নিতে পেরেছি। খুটখুট শব্দে ঘুম ভেঙে গেল।

 

দেখলাম আমার কন্যা তার মায়ের জুয়েলারি বক্স নামিয়ে কার্পেটের উপর দোকান খুলে বসেছে। বিছানা থেকে নেমে পা রাখব, সে উপায় নেই। এত এলোমেলো করে ফেলেছে এগুলো গুছিয়ে রাখার কথা ভেবে আমার মাথা ঘুরে উঠল। তাকে বকা দিতে পারলাম না, যখন দেখলাম কন্যার হাতে তার মায়ের চুড়ি ফিট করেছে।  আলমিরা থেকে আমার শাড়ি পরে কোমরে হাত দিয়ে মডেলদের মত ভঙ্গিমায় ড্রেসিংটেবিলের আয়নায় ঘুরে ফিরে নিজের প্রতিবিম্ব দেখছে। দৃশ্যটি দেখে আমার সব বিরক্তি এক লহমায় দূর হয়ে গেল। আজ ২০ ডিসেম্বর। মিলিকন্যার জন্মদিন। “মিলিকন্যা” শব্দটি  আমার এক ঘনিষ্ঠজন ব্যবহার করেন।

 

২০০৪ সালের ২০ ডিসেম্বর আমার কোল আলো করে জন্ম নেয় ফুটফুটে এই মেয়েটি। চট্টগ্রামের নামকরা গাইনী বিশেষজ্ঞ ডা. শাহানারা চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে ছিলাম আমি। কিছু চিকিৎসক রোগীদের বেলায় লক্ষী, এমন ধারণা আমার মনে  জন্মেছে শ্যামলবর্ণ মিষ্টি চেহারা  ছিপছিপে ফিগারের ডা. শাহানারা সম্পর্কে। তার হাতের যশ আছে। প্রথম প্রেগন্যান্ট হবার অভিজ্ঞতা আমার কাছে খুব ভয়ংকর ছিল। নড়াচড়া করতে ভয় পেতাম। মনে হত আমার নড়াচড়ার কারণে গর্ভজাত বাচ্চার যদি ক্ষতি হয়? রাতে ঘুমের ঘোরে পাশ ফেরার সময় আমি আগে উঠে বসতাম, তারপর আস্তে আস্তে কাত হয়ে শুতাম।

 

তখন আমার ট্রিটমেন্ট করেছিলেন ইরানি বংশোদ্ভূত ডাক্তার নাজমা মোহাম্মদ আলী। দুধের মত সাদা তার ত্বক। টিয়াপাখির মত মায়াবী ঠোঁট, হাঁটার ভঙ্গী ছিল অদ্ভুত সুন্দর। বাচ্চা নিয়ে আমার অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা দেখে নাজমা আপা হাসতেন। সব সময় খুব উৎফুল্ল থাকতেন। একদিন প্রচণ্ড মাথাব্যথা নিয়ে চেক আপে গিয়েছিলাম তার চেম্বারে। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “মিলি তোমার ব্যথা কিন্তু মনের। তুমি দিন দিন দুশ্চিন্তার দিকে ঝুঁকে পড়ছ। এটা বাচ্চার জন্য খুব ক্ষতিকর। তুমি কি একটা সুস্থ বাচ্চা চাওনা?” আমি শুকনো মুখে বললাম, “নাজমা আপা পেটে কাঁপুনি হয়। আমি পরিষ্কার দেখতে পেয়েছি পেটের ভেতর থেকে কি একটা লাঠির মত গুঁতো দিচ্ছে। ভয়ে আমার দম আটকে যাচ্ছিল।” উনি এক মিনিট মনভরে হেসে নিলেন। তারপর বললেন, ওই লাঠিটা কি জানো? ওটা তোমার বাচ্চার মজবুত পা। মাকে লিটল বিট হার্ড টাইম দিচ্ছে। অনেক দুষ্টু হবে তোমার বাচ্চা। দুনিয়াতে আসলে ম্যারাডোনা হবে। আমার ছেলের জন্ম হল। নাজমা আপার কথা সত্যি হয়েছে। সে খুব দুষ্টু হয়েছে।

 

একদিন আমার প্রিয় গায়িকা ফাহমিদা নবী পিয়াল সম্পর্কে বললেন, “তোমার ছেলেটির তাকানোর ভাবভঙ্গী অনেক দুষ্টুমিতে ভরা। অভিব্যক্তি দেখলে বুঝা যায় বাচ্চা ভয়ংকর কাচ্চা ভয়ংকর।” ফাহমিদা আপার কথাগুলো আমি খুবি এনজয় করেছি। ডা. নাজমা মজা করে আমাকে সম্বোধন করতেন কুমারী মা বলে। আজ আঠার বছর পর মনে হয় তখন সত্যিই কত আনাড়ি ছিলাম। আমার দুই সন্তানের ডেলিভারি হয়েছে সি- সেকশনে। অর্থাৎ সিজারিয়ান বেবি। দুই বাচ্চার সময় ডাক্তার বদল হয়েছিল কিন্তু এনেস্থেসিওলজিস্ট একজনই ছিলেন, হারুন সাহেব। আমার ছেলের জন্মের ছয় বছর পর মেয়ের জন্ম হয়। জিইসি মোড়ে অবস্থিত রয়েল হাসপাতালে অপারেশন থিয়েটারে আমাকে দেখে চিনে ফেললেন হারুন সাহেব। ডা. শাহানারা চৌধুরীকে বললেন,  “এই মেয়েকে আমি চিনি। ও’ খুব সেনসিটিভ।”

 

পায়ে হেঁটে গিয়ে আমি অপারেশন থিয়েটারে ঢুকেছি। যদিও এমন নিয়ম নেই বলেছিল ডিউটি ডাক্তার এবং নার্সরা। রোগী হেঁটে ওটি’তে ঢুকেছে দেখলে ডা. শাহানারা রেগে তুলকালাম কাণ্ড বাঁধিয়ে ছাড়বেন, এমনটি আশংকা করছিল তারা। হলও তাই। এনেস্থেসিওলজিস্ট হারুন সাহেবের সাথে গল্প করছিলেন ডা. আপা। আমাকে দাঁড়ানো অবস্থায় দেখে অগ্নিমূর্তি ধারণ করলেন। ভয়ে কাঁপতে লাগল নার্স ও ডিউটি ডাক্তার। তারা ম্যাডাম, ম্যাডাম করে কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু শাহানারা আপা প্রচণ্ড ধমক দিয়ে তাদেরকে থামিয়ে দিলেন। আমার খারাপ লাগল ওই দৃশ্য দেখে। কারণ ওদের কোনো অপরাধ নেই। আমি ডাক্তার আপাকে অনুরোধ করলাম তাদেরকে যেন বকাবকি না করেন। তারা আমাকে স্ট্রেচারে তুলতে চেয়েছিল।

 

কিন্তু আমি স্বেচ্ছায় পায়ে হেঁটে ওটি’তে ঢুকেছি। উনি আমাকে সতর্ক করলেন, যা করেছি তা খুব অনুচিত কাজ হয়েছে। কোন দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারত একথা বললেন। যাই হোক আমি শুয়ে পড়লাম। পালপিটিশন খুব বেশি হচ্ছিল। হারুন সাহেব এবং শাহানারা আপার মুখ চিন্তিত। দু’জনের চোখের দৃষ্টি মনিটরে। আমার ব্লাড প্রেশার হাই হয়ে বসে আছে। নামার লক্ষণ নেই। এদিকে পেইনও বাড়ছিল। একটু একটু ব্লিডিং হতে শুরু করল। মজার বিষয় হল আমি ওটি’তে ঢোকার আগে খুব সাজুগুজু করেছিলাম। লিপস্টিক লিপ লাইনার কাজল আইশ্যাডো পারফিউম কিছুই বাদ যায়নি।

 

হারুন ভাই শাহানারা আপা সাজগোজের ব্যাপার নিয়ে আমার সাথে কিছুক্ষণ মজার মজার কথা বললেন। আজ ভাবতে খুব খারাপ লাগছে যে হারুন ভাই বেঁচে নেই। বছর তিনেক আগে মারা গেছেন। ভাল মানুষগুলো খুব তাড়াতাড়ি দুনিয়া থেকে চলে যায়। এনেস্থিসিয়া দেওয়ার সাথে সাথে ঘুমের কোলে ঢলে পড়লাম। অনুভুতি অবশ, মনে হচ্ছিল শুন্যের উপর কে যেন আমাকে চরকার মত ঘোরাচ্ছে। আমি মাটি আঁকড়ে ধরতে চাচ্ছি কিন্তু অচেতন শক্তির সাথে লড়াই করে পারছিনা। মুখমণ্ডলেও অনুভুতি নেই। তবুও খুব জোর খাটিয়ে ঠোঁটদুটো নাড়িয়ে নেশাগ্রস্তের মত বললাম, “আপা পেট থেকে গরুর বাচ্চার মত কি টানছেন? ব্যথা পাই তো……!”

 

কানে এল পুরুষ কণ্ঠস্বর — দেখেছেন আপা আমি বলেছি না ও খুব সেনসিটিভ !!

 

[লেখিকা: নিউইয়র্ক প্রবাসী]

Facebook Comments

এ সংক্রান্ত আরো খবর




সম্পাদক: আরিফা রহমান

২৮/এফ ট্রয়োনবী সার্কুলার রোড, ৫ম তলা, মতিঝিল, ঢাকা।
সর্বক্ষণিক যোগাযোগ: ০১৭১১-০২৪২৩৩
ই-মেইল ॥ sangbad24.net@gmail.com
© 2016 allrights reserved to Sangbad24.Net | Desing & Development BY Popular-IT.Com, Server Manneged BY PopularServer.Com