ads

বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে পণ্যের সঙ্গে যৌনতা, লোভ এবং আনন্দও বিক্রি করা হচ্ছে

আল মামুন

সংবাদ২৪.নেট ডেস্ক: বাংলাদেশের গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন এবং নৈতিকতা বিষয়ে রেডিও তেহরানের সাথে এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার দিয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক আ-আল মামুন। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

 

প্রশ্ন: বাংলাদেশে আজকাল বেশকিছু অশালীন বিজ্ঞাপন নিয়ে আলোচনা চলছে। ক্রিকেটার সাব্বিরের সঙ্গে মডেল লায়লা নাঈমের একটি বিজ্ঞাপন এরইমধ্যে প্রচার বন্ধ করে দিয়েছে টেলিভিশন চ্যানেলগুলো। এমন আরো বিজ্ঞাপন দেশের মূলধারার গণমাধ্যমে কিংবা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে প্রচারিত হচ্ছে। অথচ, শালীন বিজ্ঞাপনের মাধ্যমেও পণ্যের প্রচার ও প্রসার বাড়ানো সম্ভব। তাহলে কেন এই অশ্লীলতার দিকে ঝুঁকে পড়া?

 

অধ্যাপক আ- আল মামুন: দেখুন, শালীন বা অশালীন- এ প্রশ্নটি খুবই আপেক্ষিক। প্রশ্নটি সমাজের একেকটি স্তরে একেক রকমের হয়ে থাকে। ফলে আমরা কোনটিকে শালীন বলব আর কোনটিকে অশালীন বলব সে বিষয়টি খুবই সতর্কভাবে উচ্চারণ করা দরকার। আপনি মডেল লায়লা নাঈম এবং সাব্বিরের যে বিজ্ঞাপনটির কথা বলছেন যদি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি নিয়ে ভাবি তাহলে অবশ্যই বলতে হবে এটি আমাদের জন্য খুবই অস্বস্তিকর।

 

বিজ্ঞাপনের বিষয়টি এরকম যে-বিজ্ঞাপন সব সময় বিক্রি করতে চায়। আজকে আমরা যে ধরনের সমাজে বসবাস করি, যে ধরনের অর্থনৈতিক নীতির মধ্যে বসবাস করি তার লক্ষ্য হচ্ছে বিক্রি করা। যেমন ধরুন মুক্তবাজারের ধারা আমাদের সমাজের প্রতিটি স্তরে স্পর্শ করে যাচ্ছে। ফলে দেখা যায় শুধু বিজ্ঞাপন না অনেক ক্ষেত্রেই সমাজের জন্য গ্রহণযোগ্যতার সীমা আমরা মানতে পারছি না। আর এ বিষয়টি বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রেও হচ্ছে।

 

বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে অনেক ঘটনা ঘটছে। ইঙ্গিতপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করা হচ্ছে বিজ্ঞাপনের চরিত্রের দেহভঙ্গিতে। যদি আমরা বিক্রির নীতিটাকে মেনে নেই তাহলে বিজ্ঞাপনে শালীনতার প্রশ্নটি ওঠানো যায় না।

 

তবে আমাদের সিরিয়াসলি যে বিষয়টি বলা দরকার সেটি হচ্ছে- আমাদের বিক্রির সীমা আসলে কী। অর্থাৎ আমরা কি কি জিনিষ বিক্রি করতে পারি আর কি কি বিক্রি করতে পারি না। পণ্য বিক্রির সীমা ও নীতি কি হবে এবং তার জন্য বিজ্ঞাপন কিরকম হবে সে বিষয়টি ঠিক হওয়া দরকার।

 

আর এসব বিষয়ে আমার মতে সরকার, বিজ্ঞাপনদাতা এজেন্সিগুলো এবং মিডিয়া হাউজগুলোর পক্ষ থেকে শক্তপোক্ত একটা নীতিমালা গ্রহণ করা উচিত। তাতে স্পষ্ট থাকবে কি ধরনের জিনিষ জনগণের সামনে উপস্থাপন করা যাবে আর কি যাবে না। কিন্তু দেখা যায় আসলে সব পক্ষই বারবারই এর সীমা অতিক্রম করছে।

 

প্রশ্ন: অভিযোগ রয়েছে- আজকাল অনেক আজগুবি কথাবার্তা বলে বিজ্ঞাপন প্রচার করা হচ্ছে। যেমন কোনো পীর বা পাথরের অলৌকিক ক্ষমতায় জীবনের সব সমস্যার সমাধান, সন্তান লাভ এমনকি প্রেম-বিয়েতে সফলতা লাভ ইত্যাদি। এ ধরনের আজগুবি বিজ্ঞাপন কীভাবে প্রচার করা সম্ভব হচ্ছে? এ বিষয়ে বাংলাদেশের আইন কী বলছে?

 

অধ্যাপক আ- আল মামুন: দেখুন, বাংলাদেশের আইন বলছে এগুলো প্রচার করা যাবে না। আপনি যখন ব্যবসার নীতি মানবেন তখন সেই ব্যবসার নীতির সাথে মুক্ত বাজার প্রতিযোগিতার বিষয়টি মেনে নিতে হবে। তবে কথা হচ্ছে যেসব বিষয় স্পষ্টত প্রতারণা-যা জনগণকে প্রতারিত করছে-তা মেনে নেয়া যায় না। আপনি যেসব বিজ্ঞাপনের কথা বললেন সেগুলো বাদেও যেমন ধরুন গুঁড়ো দুধ, হরলিক্স এবং প্রসাধন সামগ্রীর বিজ্ঞাপনে অনেক বেশী পরিমাণে প্রতারণা থাকে। এসব পণ্যের গুণ ও মানের চেয়েও বিক্রি করা হয় ভিন্ন কিছু। সেখানে যৌনতা বিক্রি করা হয়, লোভ ও আনন্দ বিক্রি করা হয়। কমোডিটির সাথে আমাদের আবেগ ও অনুভূতিকে এসোসিয়েট করা হয়। আর সেই অনুভূতিগুলোই বিক্রি করছে কোম্পানিগুলো। যেমন ধরুন কোকা কোলা। কোকা কোলার ১ লিটারের একটি পানীয়’র সর্বোচ্চ উৎপাদন খরচ ২/৩ টাকা হতে পারে। অথচ সেটি কতদামে বিক্রি হচ্ছে। তো এসব বিবেচনাগুলো আসলে বিজ্ঞাপনদাতারা করবে না। আর মিডিয়া হাউজের এ ব্যাপারে দায়বদ্ধতা আছে। তাদের উদ্দেশ্য লাভ করতে হবে। ফলে তারা এসব বিজ্ঞাপন প্রচার করতে দ্বিধা করে না।

 

আমি বলবো এক্ষত্রে পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ এবং বিজ্ঞাপনের বিষয়বস্তু নিয়ে সরকার এবং সিভিল সোসাইটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

 

প্রশ্ন: অনেক বিজ্ঞাপনে অত্যন্ত অনাকাঙ্ক্ষিত ও অপ্রয়োজনীয়ভাবে যৌনতার বিষয়টি ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে এবং এসবের বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নারীদের ব্যবহার করা হচ্ছে। এখানে অভিযোগ রয়েছে- সমাজের এক শ্রেণির মানুষ নারীকে পণ্য হিসেবে ব্যবহার করছে। আপনি কী বলবেন?

 

অধ্যাপক আ- আল মামুন: একথা সত্যি। আর যৌনতা খুব বড় রকমের পণ্য। আমি বলতে চাইছি যেকোনো পণ্য বিক্রির সাথে যৌনতা খুব বড় রকমের বাজার চাহিদা তৈরি করতে পারে। আমি এ প্রসঙ্গে আরো বলব- ধরুন কনডমের সাথে যৌনতার সম্পর্ক আছে, প্রসাধনীর সাথে ইচ্ছার সম্পর্ক আছে কিন্তু গাড়ির সাথে বা কোকা কোলার সাথে যৌনতার কি সম্পর্ক আছে! কিন্তু পণ্য যারা বিক্রি করে তারা এগুলোর সাথেও যৌনতাকে সংযুক্ত করে থাকে। যেহেতু এটা খুব বেশী রকমের চাহিদা তৈরি করে থাকে তাই তারা এগুলোর সাথে যৌনতাকে সংযুক্ত করে থাকে।

 

আমার ধারণা পণ্যের সাথে ইচ্ছের সম্পর্কের বিষয়টি বিবেচনায় আনা উচিত। কারণ এই বিজ্ঞাপনগুলো শুধুমাত্র যে প্রাপ্তবয়স্করা দেখছেন এমনটি নয়। বাচ্চারাও যেসব বিজ্ঞাপন দেখছে তার কনটেন্টের মধ্যে এমনভাবে ম্যাসেজগুলো থাকে যে অসচেতনভাবে তা আমাদেরকে আক্রান্ত করে। ফলে সেক্সুয়াল পারভারসন এবং সেক্সুয়াল কনসেপ্ট তৈরি করে। আর এসবের জন্য বিজ্ঞাপন অনেকখানি দায়ী।

 

প্রশ্ন: এই যে নারীকে পণ্য হিসেবে ব্যবহার করে বিজ্ঞাপন তৈরি করা এবং অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে যৌনতার বিষয়টি আনা হচ্ছে। এতে সমাজের লাভ/ক্ষতির দিকটি কী? এ নিয়ে কোনো সুনিদিষ্ট গবেষণা আছে?

 

অধ্যাপক আ-আল মামুন: দেখুন বিজ্ঞাপনের যে স্তরগুলোর কথা আপনি বললেন এবং আমি বললাম এসব বিষয় নিয়ে বাংলাদেশে খুব সিরিয়াস ধরনের কোনো গবেষণা হয়নি। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং পিআইবি থেকে বিজ্ঞাপনের কনটেন্ট নিয়ে কিছু কাজ হয়েছে। তবে সেগুলো খুব সিরিয়াস এবং বড় মাপের গবেষণা একথা বলা যাবে না। বিজ্ঞাপনের বিষয়ে খুব বড় মাপের গবেষণা বাংলাদেশে হয়নি।

 

প্রশ্ন: এ ধরনের চটকদার ও অশালীন বিজ্ঞাপনের প্রচারে আসলে দায়টা কার, আর এগুলোর প্রতিরোধে সরকার কী ধরনের ভূমিকা নিতে পারে?

 

অধ্যাপক আ-আল মামুন: দেখুন, আমি আপনার প্রশ্নের আলোকে একটা উদাহরণ দিতে চাই। আমেরিকাতে ত্রিশ এবং চল্লিশের দশকে একটা নিউজ পেপারে শতকরা কতভাগ বিজ্ঞাপন থাকতে পারবে তার একটা নীতি নির্ধারণ করা হয়। তাছাড়া টেলিভিশনে কি ধরনের বিজ্ঞাপন কতোটা যাবে তারও একটা নীতিমালা ছিল। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ছিল।

 

বর্তমানে যত বেশি লিবারেল ইকোনোমির দিকে যাচ্ছি তত বেশী আর এই নীতিগুলো থাকছে না। এখন বিজ্ঞাপনের মধ্যে আমরা নিউজ দেখি। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন এসে প্রথম পাতা এবং শেষ পাতা দখল করে নিয়েছে। তাছাড়া বিজ্ঞাপনের বিষয়বস্তুতে সরকার এবং সোশ্যাল বডিগুলোর বিশেষ কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকছে না। কারণ নিউ লিবারেল অর্থনীতির প্রতি আমাদের যে ভীষণরকম আকাঙ্খা তারফলে সোসাইটির সবরকমের রীতি প্রথাকে তছনছ করে দিচ্ছে। এক্ষেত্রে বিজ্ঞাপনদাতা সংস্থা বা যারা পণ্য বিক্রি করছে তাদের ওপর দায় চাপিয়ে দিলে হবে না একইসাথে তাদের বিবেকের ওপরও আস্থা রাখা যাবে না; বা যায় নি।

 

দেখা যাচ্ছে ঐতিহাসিকভাবে গত ত্রিশ/চল্লিশ বছর ধরে সেই দায়ের জায়গাটি তারা ভাবেনা বা ভাবি নি। পণ্য বিক্রেতারা ভোক্তার চাহিদার কথা ভাবে না। ফলে আমি মনে করি যারা পণ্য কেনে এবং সরকার –তাদেরই এ দায়িত্বটা নেয়া দরকার। কি ধরনের বিজ্ঞাপন আসা দরকার, কি ধরনের বিজ্ঞাপন গ্রহণযোগ্য হবে আর কোনটা সীমা লঙ্ঘন করে সেটা রাষ্ট্র এবং সমাজ-এই দুই জায়গা থেকে দেখতে হবে।-সৌজন্যে রেডিও তেহরান

Facebook Comments

এ সংক্রান্ত আরো খবর




সম্পাদক: আরিফা রহমান

২৮/এফ ট্রয়োনবী সার্কুলার রোড, ৫ম তলা, মতিঝিল, ঢাকা।
সর্বক্ষণিক যোগাযোগ: ০১৭১১-০২৪২৩৩
ই-মেইল ॥ sangbad24.net@gmail.com
© 2016 allrights reserved to Sangbad24.Net | Desing & Development BY PopularITLtd.Com, Server Manneged BY PopularServer.Com