ads

শহীদ তাজউদ্দীনের সেই ডায়েরি আজও খুঁজছেন কন্যা সিমিন

তাজউদ্দীন

সংবাদ২৪.নেট ডেস্ক: সিমিন হোসেন রিমি জাতীয় সংসদ সদস্য। বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের মেয়ে। বাবার যোগ্য উত্তরাধিকারী হয়ে জনসেবা করে যাচ্ছেন। সরাসরি রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার আগে থেকেই সমাজকল্যাণমূলক কাজে নিয়োজিত ছিলেন। রাজনীতিতে আসার পর কাজের পরিধি বাড়িয়েছেন বহুগুণ। জেলহত্যা দিবস উপলক্ষে কথা বলেছেন তাজউদ্দিন আহমদের স্মৃতি নিয়ে।

জাতীয় চার নেতাকে খুনি মোশতাক ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর গ্রেফতার করে। তাজউদ্দিন আহমদ কত তারিখে, কি অবস্থায় গ্রেফতার হন?

সিমিন হোসেন রিমি: ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে প্রচণ্ড গুলির শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। স্বাধীনতাযুদ্ধের পর এত গুলির শব্দ আর কোনোদিন শুনি নি। আমি বারান্দায় গিয়ে দেখি আব্বু-আম্মা আগেই উঠেছেন। আব্বু বিভিন্ন জায়গায় ফোন করতে চেষ্টা করলেন। কিন্তু কেউই ফোন ধরলেন না। যাদের ফোনে পাওয়া গেছে তারাও কিছু জানেন না। সকালের দিকে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় কেউ কেউ যেন নিজেরা কথা বলছিলেন খবর শুনতে চাইলে রেডিও খুলেন। ঘটনার বিহ্বলতায় রেডিও অন করি। রেডিও খুলেই শুনতে পাই খুনি ডালিমের কণ্ঠ। খবরটা শোনার পর আব্বু খুব চুপ হয়ে গেলেন, বিমর্ষ হয়ে বললেন, ‘আমি মুজিব ভাইয়ের পাশে থাকতে পারলে তার শরীরে কেউ আঁচড় দিতে সাহস পেতো না।’ এরপরের সময় ভীষণ অনিশ্চিত।

আম্মা বারবার আব্বুকে বললেন, তুমি বাসায় না থেকে অন্তত পাশের বাসায় চলে যাও। এরই মধ্যে বাসার কাজের ছেলেটা খবর নিয়ে এলো যে আর্মিরা বাসা ঘেরাও করে ফেলেছে। একজন অফিসার এসে বললেন, ‘আমার নাম ক্যাপ্টেন শহীদ।’ এখন থেকে এই বাসায় কেউ ঢুকবে না এবং বের হওয়াও নিষেধ। আব্বু বললেন, ‘হাউস অ্যারেস্ট বলেন।’ উনি বলেন, ‘হ্যাঁ তাই।’

এক সপ্তাহ পরে (২৩ আগস্ট) পুলিশের লোকজন এসে আব্বুকে বললেন তাদের সাথে যেতে হবে। আব্বু বললেন, ‘কাপড়-চোপড় নিতে হবে?’ পুলিশরা বলল, ‘নিলে ভালো হয়।’যাওয়ার সময় আম্মা জিজ্ঞেস (আব্বুকে) করলেন, ‘কি মনে হচ্ছে, তোমারে কবে ছাড়বে-টাড়বে?’ আব্বু প্রতিটা বিষয়েই খুব ভালো আঁচ করতে পারতেন। তার মন্তব্য অঙ্কের মতো মিলে যেত। আব্বুর দূরদর্শিতার কথা মনে হলে এখনও আশ্চর্য হয়ে যাই।আম্মার প্রশ্নের উত্তরে বললেন, ‘টেক ইট ফরএভার’ (মনে কর চির জীবনের জন্য যাচ্ছি)। ঠিক এই কথাটা বলেই আব্বু সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেলেন।

আব্বুকে পুলিশের জিপে উঠানোর ঠিক আগে রাস্তার ঠিক উল্টো পাশ থেকে এক বিদেশি ভদ্রলোক প্রাণপণে দৌড়ে এসে আব্বুকে যেন কী জিজ্ঞেস করলেন। মনে হলো একটিমাত্র কথা বিনিময় হয়েছে। এরপরই গাড়িটি ছেড়ে দিল।

ওই বিদেশি ভদ্রলোক কে ছিলেন?

সিমিন হোসেন রিমি: আমাদের বাসার ঠিক উল্টো পাশে (রাস্তার ওপারে) একটি মুদির দোকান ছিল। ওখানে একটি বড় গাব গাছ এবং একটি তেঁতুল গাছ ছিল। খুব ছোটবেলা থেকেই জানতাম গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন ওই গাছগুলোর নিচে থেকে আব্বুকে পর্যবেক্ষণ করত। কখনো ঝাল-মুড়িওয়ালা, কখনও গায়ে কালি মেখে পাগল সেজে। ঠিক ওই জায়গায় বিদেশি লোককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিলাম। প্রায় ৩২ বছর পর আমি জানতে পেরেছি তিনি ছিলেন সাংবাদিক লরেন্স লিফসুলৎজ। লরেন্স আব্বুকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আপনার কি মনে হয় মন্ত্রিসভা গঠন করার জন্য আপনাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।’ আব্বু উত্তর দিয়েছিলেন, ‘না, আমার তা মনে হয় না।’ অর্থাৎ তিনি নিশ্চিত ছিলেন।

১৫ আগস্ট শুক্রবার ছিল। ১৮ আগস্ট সোমবার আমাদের স্কুল খুলবে। আমরা সবাই হাউস এরেস্ট। বাসার চারপাশ ঘিরে আর্মির লোকজন পাহারায়। আমাদের নিচের তলায় রীতিমতো কন্ট্রোল রুম খুলে বসেছে। এর মধ্যে আমাদের দুই বোনের স্কুলে যাওয়ার অনুমতি চাইলে ওপরের লেভেলে কথা বলে অনুমতি দিল।

আমি তখন ভিকারুননেসা নূন স্কুলে ক্লাস নাইন-এ পড়ি, ছোট বোন মিমি পড়ে ফাইভ-এ। স্কুল থেকে আসা-যাওয়ার পথের বাইরের বিবরণ জানতে চাইতেন বন্দিদশায় থাকা আব্বু। বিবরণ দিতাম ১৯৭১ সালে যেমন বস্তার ওপর রাইফেল নিয়ে পাহারা দেখা যেত, শাহবাগের বেতার ভবনের সামনে তেমন পাহারা বসানো হয়েছে। আমার আসা-যাওয়ার পথে ৩টি ট্যাংক দেখেছি। একটি থাকত শাহবাগ মোড়ে।স্কুল থেকে যাওয়ার আসার সময় আমাদের বইপত্র তন্নতন্ন করে দেখা হতো। আমাদের গাড়ির পেছনে গোয়েন্দাদের গাড়ি যেত, দেখত আমরা স্কুল ছাড়া অন্য কোথাও যাই কি-না।

গ্রেফতার করার আগে মুশতাক সরকারের পক্ষ থেকে তাজউদ্দিন আহমদকে মন্ত্রিসভায় যোগদানের কোনো আমন্ত্রণ জানিয়েছিল কি?

সিমিন হোসেন রিমি: না, ওই রকম কোনো অফার আসে নি। (অন্তত তাজউদ্দিন আহমদকে) অফার দেওয়ার কথা হয়তো এরা ভাবতেই পারেনি। খন্দকার মোশতাকরা খুব ভালোভাবেই জানত তাজউদ্দিন কী ধরনের মানুষ। তাই তাকে কোনো প্রলোভন দেখানোর সাহসটুকুও ছিল বলে আমার মনে হয় না।

সরকারের বাইরের কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি কি তাজউদ্দিন আহমদের সাথে দেখা করতে এসেছিলেন?

সিমিন হোসেন রিমি: ১৫ আগস্ট দিবাগত রাত দেড়টার দিকে একের পর এক বেলের শব্দে ঘুম ভাঙল। ভয় পেয়ে সবাই বেরিয়ে এসেছি, দরজা খুলে দেখা গেল মেজর ডালিম এসেছেন। বাসায় ঢুকেই মেজর ডালিম বললেন, ‘ভয় পাবেন না, আপনার নিরাপত্তার জন্যই এই ব্যবস্থা করা হয়েছে।’ তখন আব্বু প্রচণ্ড রেগে গিয়ে ডালিমকে বললেন, ‘তুমি দেখতে এসেছ আমি বন্দি হয়েছি কি-না।’ ডালিমের সাথে থাকা আরেকজন বলে উঠলেন, ‘হ্যাঁ আপনি যা ভাবেন তাই।’ একই সাথে জানতে চাইলেন, ‘মিসেস তাজউদ্দিন কোথায়?’ এরা নিশ্চিত হতে চাইছিল যে মিসেস তাজউদ্দিনও গ্রেফতার আছে কি-না। আম্মাকে দেখেই ওরা বের হয়ে চলে গেল।

২৩ তারিখে বাসা থেকে নিয়ে যাওয়ার পর কি হলো?
সিমিন হোসেন রিমি : গ্রেফতারের পর সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত আব্বুর কোনো খোঁজ আমরা জানতে পারি নি। টেলিফোন লাইন কাটা, বাজার করতে গেলেও কাজের লোকদের সব কিছু পরীক্ষা করে দেখত। শুধু খবরের কাগজ থেকে জানতে পেরেছিলাম যে, ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে আব্বুকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কিন্তু কোথায় আছে তা জানি না।

একদিন হঠাৎ চিন্তা করলাম, গাড়ি থেকে স্কুলের গেইটে যখন নামিয়ে দেয় তখন স্কুল গেইটে মোটামুটি ভীড় থাকে। ওই সময় সেখান থেকে পালিয়ে আত্মীয়ের বাসায় যাওয়া যাবে। একদিন সাহস করে তাই করলাম। চলে গেলাম মগবাজারে আমাদের এক আত্মীয়ের বাসায়। স্কুল ছুটি হতো দুপুর ১টা ১০ মিনিটে। ছুটি হওয়ার আগেই স্কুলে ফিরে এলাম। যথারীতি গাড়ি করে বাড়ি গেলাম। কেউ বুঝতে পারল না। সাহস পেলাম। এরপর দুই দিন নিয়মিত স্কুল করে আরেক দিন স্কুল গেইটের ভিড়ের মধ্যে দিয়ে অন্য গেইটে বের হয়ে চলে গেলাম পুরান ঢাকার ছোট চাচার বাসায়। চাচা এবং আমাদের পারিবারিকভাবে ঘনিষ্ঠ হাসান ভাইকে বললাম জেলখানায় আব্বুর সাথে দেখা করার ব্যবস্থা করার জন্য। তারা সেই ব্যবস্থা করে আমার স্কুলে এসে পাস দিয়ে যায়।

তখনও বাসার সবাই হাউস অ্যারেস্ট। স্কুল থেকে বাসায় ফেরার সময় আমার বই তল্লাশি করার সময় আর্মিদের পাস দেখিয়ে দিয়ে বললাম, আমার বইখাতা দেখতে হবে না। ওরা তো অবাক। আমাকে বাসার নিচতলা ওদের কন্ট্রোল রুমের মধ্যে নিয়ে যায়। জেলখানায় দেখা করার বিষয়টি ওপরের অফিসারদের সাথে কথা বলে জানাল, আম্মা ছাড়া সবাই যেতে পারবে। আমি রাজি হলাম না। বললাম সবার অনুমতি আছে, তাই আমরা সবাই যাব। আবারও ওপরের অফিসারের সাথে কথা বলে আম্মাসহ যাওয়ার অনুমতি দিল। আমরা সবাই একসাথে গেলাম। জেলে গিয়ে দেখা হতেই আব্বুর প্রথম কথা ‘কি ব্যাপার এক মাস হয়ে গেল তোমাদের কোনো খোঁজ নেই?’ তখন আমাদের অবস্থার কথা জানালে আব্বু বললেন, ‘আমাকে তো জানানো হয়েছে অ্যারেস্ট করার পরের দিনই বাসা থেকে আর্মি উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে।’ এরপর আব্বু হয়তো কারও সাথে কথা বলেছেন। পরের দিনই আমাদের বাসা থেকে আর্মি উঠিয়ে নেওয়া হয়।

ওই সময় আপনাদের পরিবার কীভাবে চলছিল?

সিমিন হোসেন রিমি: বলে বোঝানো যাবে না। কেউ আমাদের বাসায় আসেন না। যেন এক জীবন-মৃত অবস্থা। হাউস অ্যারেস্ট উঠে গেলে বাড়ির পরিবেশের তেমন কোনো উন্নতি নেই। নিচতলায় বাচ্চাদের একটা স্কুল ছিল। ১৫ আগস্টের পর তারা চলে গেছে, এখানে আর স্কুল চালাবে না। বাচ্চাদের অভিভাবকদের কেউ বাচ্চাদের নিয়ে আমাদের বাসায় আসতে চায় না। ফলে যে ভাড়া পাওয়া যেত সেই ব্যবস্থাও গেল। নতুন কেউ ভাড়া নিতে এলে যেই শোনে তাজউদ্দিন আহমদের বাসা, তখন পারলে পালিয়ে বাঁচে, এমন অবস্থা। এরই মধ্যে আব্বুসহ অন্যদের আটকের বিরুদ্ধে একটি রিট পিটিশন দায়ের করলেন আম্মা। পিটিশনটি ৫ নভেম্বর শুনানির কথা ছিল। কিন্তু ৩ নভেম্বরই তো যা হওয়ার হয়ে গেল। সর্বশেষ ১ নভেম্বর আম্মা আইনজীবীদেরসহ আব্বুর সাথে দেখা করে এসেছিলেন।

আপনার আম্মার সাথে শেষ কী কথা হয়েছিল?

সিমিন হোসেন রিমি: সেদিন আম্মাকে আব্বু বলেছিলেন, ‘একটা ডায়রি লিখছি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আদ্যপান্ত কথাবার্তা আছে সেখানে। ৫০০ পৃষ্ঠার ওপরে হবে লাল মলাট, কালো বর্ডার, ওটা একটু খেয়াল রেখ।’ আম্মাকে নাকি বারবার এই কথাটা বলেছিলেন আব্বু। আম্মার কাছ থেকে শোনা ঘটনা এটি। কিন্তু সেই ডায়েরি আমরা আর পাইনি। আজো আমি সেই ডায়েরিটি খুঁজে বেড়াচ্ছি।

 ২ নভেম্বর আপনার পিতাকে ঘিরে কোনো উদ্যোগ ছিল কি?

সিমিন হোসেন রিমি: এর আগের দিন আম্মা দেখা করে বাসায় আসার পর আম্মাকে খুব উদ্ভ্রান্তের মতো লাগছিল। যেই রাতে আব্বুকে মেরে ফেলে সেই রাত্রটা আমি ও আম্মা ঘুমাতে পারি নি। আম্মা বলছিলেন, তার কেমন জানি লাগছে, আমারও মনে শান্তি পাচ্ছিলাম না, ঘুম আসছিল না। তখন আমি আম্মার রুমে এসে শুয়েছি। খাটে আমি আর সোহেল, নিচে বিছানা করে শুলেন আম্মা। কিছুক্ষণ পরপরই আম্মা আমাকে ডেকে বলছেন, ‘এই রিমি ঘুমালি না-কি?’ প্রতিবারই আমি সাড়া দিতাম।

ভোরের দিকে এক অদ্ভুত অনুভূতি না-কি স্বপ্ন জানি না। দেখলাম খাটের কোণায় হ্যাঙ্গারে রাখা আব্বুর শার্টটা যেভাবে তিনি রেখে গেছেন সেভাবেই ঝুলেছিল। আমার মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল আব্বু সেখানে দাঁড়িয়ে আছেন। এভাবেই রাত কাটে, সকালে ঘুম ভাঙে ফাইটার বিমানের শব্দে। সবার মনেই কি যে অবস্থা সে সময় বলে বুঝানো যাবে না। বাসার ফোন লাইন কাটা। সামনের বাসা থেকে অনেক জায়গায় ফোন করেও কোনো খবর পাওয়া যাচ্ছে না। দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। কেউ কিছু জানে না। যারা জানে তারা আমাদের জানায় নি। এভাবেই ৩ নভেম্বরের সারাদিন কেটে গেল।

এরপর খবর পেলেন কীভাবে?

সিমিন হোসেন রিমি: ৪ নভেম্বর সকালবেলা পুরান ঢাকার কিছু লোকের কাছ থেকে জানা গেল ৩ নভেম্বর দিবাগত রাতের ভোরবেলায় জেলখানায় গুলির শব্দ হয়েছে। জাতীয় নেতারা যে সেলগুলোতে ছিলেন তার পাশেই পুরান ঢাকার উর্দু রোড। ওই এলাকার মানুষজন ফজরের আজানের সময় গুলির শব্দ শুনেছেন। জেলখানায় গাজীপুরের একজন ডাক্তার ছিলেন। তার কাছে খবর নেওয়া হলো, তিনি কাউকে কিছু বলেন না, শুধু হাউমাউ করে কাঁদেন। তখন আমরা নিশ্চিত হলাম কিছু একটা ঘটেছে।

 ঠিক কয়টার দিকে হত্যার কথা জানতে পারেন?

সিমিন হোসেন রিমি: ৪ তারিখ দুপুরের পর আমাদের কাছেই থাকা মেঝো চাচার বাসায় গেলাম। কোনো নতুন খবর নেই। বের হয়ে যাব এই সময় সাদা কাপড় পরা একজন মহিলা চাচার খোঁজে এলেন। চাচাকে বাসায় না পেয়ে বড় কেউ বাসায় আছেন কি-না জানতে চান। সেখানে তখন ইন্টারমিডিয়েট পড়তেন আমার এক ফুফাতো ভাই ছিলেন। পাশের রুমে তারা কি জানি কথা বললেন। মিনিট খানেক পরেই আমার ওই ফুফাতো ভাইয়ের গোঙ্গানির শব্দ শুনতে পেলাম। ফ্লোরে পড়ে মামা মামা বলে কাঁদছেন তিনি। পাশের কেউ একজন বলছিলেন, ওই মহিলা (সাদা শাড়ি পরা) খালেদ মোশাররফের মা। আমি তখন এক মিনিটও সময় ব্যয় না করে বাসার দিকে রওনা হলাম। আমাদের বাসার সামনে লোকে লোকারণ্য। হাজার হাজার মানুষ। রাস্তায় মানুষের ভীড় ঠেলে বাসার দিকে যাচ্ছি আর শুনছি, নেতার লাশ দাবি করা হবে, শহীদ মিনারে প্রতিবাদ হবে, লাশ আমাদের দিতেই হবে ইত্যাদি।

এসব কথা শুনছি কথা আর ভিড় ঠেলে এগুচ্ছি ঠিক তখনই বাসার সামনে দেখি আব্বুর দুই বন্ধু ডা. করিম এবং তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল ফকির শাহাবুদ্দিন। তাদের পেছনে পেছনে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠলাম। আম্মাকে তারা জানালেন, ‘বন্ধু নেই।’ আম্মার শান্ত স্থির স্থির হয়ে যাওয়া চেহারা দেখে আমি দাঁড়াতে পারছিলাম না। আম্মাকে মনে হয়েছিল যেন পাথর হয়ে স্তব্ধ হয়ে গেছেন। ওই দিন রাত সাড়ে ১২টায় আব্বুর মৃতদেহ বাসায় নিয়ে আসে। মৃতদেহ আসার আগেই আর্মির লোকজন আবারও অবস্থান নিয়েছে বাসায়। সকাল থেকে বাসার সামনে এত লোক ছিল যে সামলানোই কঠিন ছিল। মানুষের ভীড়ে আর্মির লোকজন ক্ষুব্ধ হচ্ছিল। তারপরও যারা উপস্থিত ছিল তাদের সবাই আব্বুকে শেষবারের মতো দেখার সুযোগ দিয়েছিল। নেতৃস্থানীয়দের মধ্যে রংপুরের সংসদ সদস্য মতিউর রহমানসহ বেশ কয়েকজন ছাত্রনেতা এসেছিলেন। অনেক দূতাবাসের পক্ষ থেকে আব্বুর প্রতি সম্মান জানানো হয়েছিল। তবে, সবার কথা মনে নেই। সেখানে অনেকে দাবি জানাল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের তিন নেতার কবরের পাশে আব্বুদের কবর দেওয়া হবে। কিন্তু আর্মিরা বাধা দিল, লাঠিচার্জ করল। অনেককে সাময়িক গ্রেফতার করল। তড়িঘড়ি করে আমার অসুস্থ মেঝো চাচা নিজেই জানাজা পড়লেন বাসার সামনের আম গাছের নিচে। (তাজউদ্দিন আহমদের হাতে লাগানো সেই গাছটা এখনও আছে, ১৯৬৯ সালে নিজের হাতে সেই গাছ লাগিয়েছিলেন)।

কবর দেওয়া হলো কত তারিখ?

সিমিন হোসেন রিমি: আব্বুকে কবর দেওয়া হলো ৫ নভেম্বর। এই দিনই আম্মা যে রিট আবেদন করেছিলেন তার শুনানির কথা ছিল। কবর দেওয়ার পর খবর এলো আবার না-কি আমাদের বাসায় হামলা হবে। আতঙ্কিত আব্বুর বন্ধুরা মিলে আমাদের চার ভাইবোন এবং আম্মাকে একেকজন একেক রিকশায় করে নিয়ে ছুটলেন আশ্রয়ের সন্ধানে। ৬ তারিখ পর্যন্ত আমরা কেউ কারও খবর জানতাম না। ৭ নভেম্বর আবার বাসায় গেলাম। খালি বাসা থেকে অনেক জিনিসপত্র খোয়া গেছে। সেদিন গভীর রাতে আবার গুলাগুলির শব্দ, আতঙ্কে সবাই অস্থির। বাসায় তখনও পুলিশের পাহারা ছিল।

ওই পুলিশের সদস্য কয়েকজন বললেন, হয়তো আপনাদেরও মেরে ফেলবে। আপনারা যেখানে পারেন পালিয়ে যান, আমরা আপনাদের দেখব না, কিছু বলব না। তখন রাত আড়াইটা। প্রচ- শীতে আম্মাসহ আমরা ১৯ নম্বর রোডে (ধানমন্ডির) চাচার বাসায় যাই। দরজায় অনেকক্ষণ নক করার পর তারা টের পায়। ওই রাতে না-কি সত্যিই কয়েক ট্রাক আর্মির লোকজন এসেছিল।

এরপরের দিন আমরা চলে যাই রাজাবাজার এলাকায়। এভাবে ঘুরে ঘুরে কয়েক বাসায় থাকা হয়েছে। আব্বুর কুলখানি থেকে শুরু করে ধর্মীয় ন্যূনতম কোনো আনুষ্ঠানিকতা পালন করতে পারিনি তখন। পরে জানলাম আব্বুকে বনানীতে কবর দেওয়া হয়েছিল। কবর জিয়ারত করতে গেলে আর্মির লোকেরা একজনের বেশি ঢুকতে দিত না। ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত এভাবে একজন করে গিয়ে কবর জিয়ারত করতে হয়েছে। কারণ তখন পর্যন্ত পুরো কবরস্থানের নিয়ন্ত্রণ ছিল আর্মির হাতে। বেশি লোক একসাথে কবর জিয়ারত করে মিছিল করে ফেলবে, গণ-আন্দোলন হয়ে যাবে, বা কবর তুলে নিয়ে যাবে, এই ভয় ছিল আর্মির।

 জেলখানায় বাবা সঙ্গে আপনার শেষ দেখা কবে হয়েছিল?

সিমিন হোসেন রিমি: আমি সর্বশেষ দেখা করেছিলাম ২২ অথবা ২৩ অক্টোবর। সপ্তাহ দশ দিনে একদিন দেখা করতে দিত। মনসুর আলী চাচার সাথেও একবার দেখা হয়েছিল। আমাদের দেখে সে-কি কান্না। চাচার একমাত্র মেয়ে শিরিনকে ধরেও খুব কেঁদেছিলেন তিনি।

আপনার পিতাকে হত্যার আগে-পরে পারিবারিকভাবে কি ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন?

সিমিন হোসেন রিমি: অক্টোবরের মাঝামাঝি সময় থেকে শুরু হয় নতুনভাবে মানসিক নির্যাতন, নানা প্রশ্ন নিয়ে আর্মির লোকজন আসতে শুরু করে বাসায়। একদিন বাইরে থেকে আমাদের বাসার ছবি এমনভাবে তুলতে থাকে, যেন বড় দেখায় বাড়ি। তাদের ধারণা, বাসাটা স্বাধীনতার পর আব্বু মন্ত্রী থাকার সময় করা হয়েছিল। অর্থাৎ, আব্বুর দুর্নীতির খবর খুঁজতে এসেছেন তারা। অনেক প্রশ্ন তাদের, আম্মাকে প্রশ্ন করে আপনার রাশিয়া পড়–য়া ছেলেটা কোথায়। পাঁচ বছরের সোহেলকে ওদের সামনে এনে বলেন, এই তো আমার একমাত্র ছেলে। আমরা সামনেই ছিলাম।

মজার কথা না দুঃখের কথা কি বলব বুঝতে পারছি না। ওই সময় তাজউদ্দিন নামে যত ছাতার কোম্পানি, হোসিয়ারি কোম্পানি এবং লঞ্চ মালিকের নাম ছিল- সব কিছুর তালিকা নিয়ে এলো গোয়েন্দারা। তারা না-কি তথ্য পেয়েছে এগুলো সব আব্বুর কোম্পানি। এসব নিয়ে গোয়েন্দারা জেলাখানায় আব্বুর কাছেও জিজ্ঞাসাবাদ করতে গিয়েছিল।একসময় তারা বুঝতে পারে এসবের সাথে আমাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। আমাদের বাড়িটা করা হয়েছিল ১৯৬০-৬১ সালে হাউস বিল্ডিংয়ের লোন নিয়ে। আম্মা তাদের সব কাগজ দেখালেন। তখন তাদের ভুল ভাঙল।

এরপর লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত আমার চাচার বাসায় গিয়ে খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করল আমাদের বেনামে কোনো সম্পত্তি আছে কি-না। ভাড়া বাসায় থাকা অসুস্থ চাচাকে দেখতে পেরে গোয়েন্দারা আশাহত হয়। সবশেষে গোয়েন্দারা নিজেরাই লজ্জিত হয়। শেষে আমাদের সাথে ভালো ব্যবহার করে বিদায় নেয়।-পূর্বপশ্চিম

Facebook Comments

এ সংক্রান্ত আরো খবর




সম্পাদক: আরিফা রহমান

২৮/এফ ট্রয়োনবী সার্কুলার রোড, ৫ম তলা, মতিঝিল, ঢাকা।
সর্বক্ষণিক যোগাযোগ: ০১৭১১-০২৪২৩৩
ই-মেইল ॥ sangbad24.net@gmail.com
© 2016 allrights reserved to Sangbad24.Net | Desing & Development BY Popular-IT.Com, Server Manneged BY PopularServer.Com