ads

কাউছ মিয়া আর হাকীমপুরী জর্দা এবং শীর্ষ করদাতা

কাউছ মিয়া

সংবাদ২৪.নেট ডেস্ক: হাকীমপুরী জর্দা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের মালিক হাজী মো. কাউছ মিয়া এখন দেশের শীর্ষ করদাতা। যিনি ১৯৫০ সালে মায়ের কাছ থেকে নেওয়া মাত্র ৮০ টাকার পুঁজিতে ব্যবসা শুরু করেছিলেন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এই সাধারণ জীবনযাপন করা মানুষটিকে টানা তিন বার শীর্ষ করদাতার খেতাব দিয়েছে।

কথা হয় রাজধানীর আগা নওয়াব দেউরীতে অবস্থিত জর্দা তৈরির অফিসে। চাঁদপুর জেলার রাজরাজেস্বর গ্রামে (ব্রিটিশ আমলের ত্রিপুরা) জন্ম নেওয়া ৮৬ বছর বয়সী কাউছ মিয়া জানিয়েছেন, সৎভাবে ব্যবসা করেও এই দেশে শীর্ষ করদাতা হওয়া সম্ভব। কর দেওয়া যে গৌরবের, সেটি তিনি প্রমাণও করেছেন। ২০০৮ সাল থেকে তিনি শীর্ষ করদাতার তালিকায় নাম লেখিয়েছেন।  শুধু তাই নয়, এর আগে ১৯৬৭ সালে পাকিস্তান সরকারও তাকে শীর্ষ করদাতা হিসেবে পুরস্কার দিয়েছিল। ১৯৫৮ সাল থেকেই তিনি তৎকালীন সরকারকে কর দিয়ে যাচ্ছেন।

এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩-১৪ অর্থবছর, ২০১৪-১৫ অর্থ বছর এবং ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দেশের শীর্ষ করদাতা  কাউছ মিয়া। ২০১৫-১৬ করবর্ষে তিনি ১৮ লাখ করদাতার মধ্যে সবচেয়ে বেশি কর দিয়েছেন। এরই স্বীকৃতি হিসেবে গতবারের মতো এ বছরও তাকে ট্যাক্স কার্ড দেওয়া হবে।  এর আগেও তিনি ৮ বার শীর্ষ ১০ করদাতার তালিকায় ছিলেন। গত সোমবার এনবিআর শীর্ষ ১০০ করদাতার যে তালিকা প্রকাশ করেছে। তাতে প্রথমে রয়েছেন আলহাজ কাউছ মিয়ার নাম।

দেশের শীর্ষ করদাতা হিসেবে আপনার অনুভতি জানতে চাই?

হাজী মো. কাউছ মিয়া: অনেক আনন্দ পাচ্ছি। অনেক শান্তি পাচ্ছি। যেমনটি পেলে মন ভরে যায়। প্রাণ ভরে যায়।

কর দেওয়ার ক্ষেত্রে দেশের অনেক বড় বড় শিল্প উদ্যোক্তা আপনার পেছনে রয়েছে কারণ কী?

হাজী মো. কাউছ মিয়া: আমি সৎভাবে ব্যবসা করি, মন খুলে কর দেই। আমার ব্যবসায় বেশি লাভ হয়। আমি সরকারকে বেশি কর দেই। আমি কখনও কর ফাঁকি দেই না। আর যারা আমার চেয়েও বেশি লাভ করে কিন্তু টাকা বিদেশে নিয়ে যায়, তারাই কর ফাঁকি দেয়।

দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীরা তাহলে কর ফাঁকি দিচ্ছেন?

হাজী মো. কাউছ মিয়া: শীর্ষ ব্যবসায়ীদের অধিকাংশই ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করছেন। তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে লাভ বেশি হলেও ব্যাংকের টাকা শোধ দিতে গিয়ে কাঙ্ক্ষিত কর দিতে পারছেন না। তবে ইচ্ছে করে কর ফাঁকি দেন, এমন ব্যবসায়ীও আছেন।

কর দেওয়ার প্রতি আগ্রহী হওয়ার কারণ কী?

হাজী মো. কাউছ মিয়া: দায়িত্ববোধ থেকে কর দিচ্ছি।  কর দিলে টাকা বৈধ হয়। আইন মানা হয়। এছাড়া  কর দিলে কেউ হয়রানি করবে না।

সরকার করের আওতা বাড়াতে চায়। আপনার মত কী?

হাজী মো. কাউছ মিয়া: মানুষ এখন আগের চেয়ে অনেক সচেতন হয়েছে। অনেকে নিজেরে সম্মান রক্ষার্থেও কর দেওয়া শুরু করেছে। আবার কেউ কেই হয়রানি থেকে বাচঁতেও কর দিচ্ছে। এসব কারণে আগামীতে করের আওতা বাড়বে।

কত টাকার বিনিয়োগ দিয়ে আপনার ব্যবসা শুরু?

হাজী মো. কাউছ মিয়া: ১৯৫০ সালে মায়ের কাছ থেকে প্রথমে ৮০ টাকা নিয়েছিলাম। এরপর মায়ের কাছ থেকে নেওয়া আরও কিছু টাকা মিলে ২ হাজার ৫০০ টাকা দিয়ে ব্যবসা শুরু করি। চাদপুর শহরের পুরান বাজার ট্রাঙ্ক পট্টিতে মাত্র ৩ টাকা মাসিক ভাড়ায় স্টেশনারির দোকান দেই। এক বছর পরই (১৯৫১ সালে) ৮০০ টাকা লাভ করি। পরের কয়েক বছর লাভের টাকা দিয়ে আরও কয়েকটি দোকান ভাড়া নেই। এভাবে ৬টি দোকানের মালিক হই। এরপর ১৯৫৫ সালে তামাক ব্যবসা শুরু করি। পাশাপাশি লজেন্স, বিস্কুট, বিড়ি, সিগারেট, পাওয়ারুটি ফ্যাক্টরি ও সাবানের সোল এজেন্ট হিসেবে কাজ করি।

অন্য কিছু বাদ দিয়ে তামাক ব্যবসায় কেন ঝুঁকলেন।

হাজী মো. কাউছ মিয়া: স্বাধীনতার আগে থেকেই এই অঞ্চলে তামাক, বিড়ি সিগারেট জনপ্রিয় ছিল। আমি মনে করিছি, দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও সবচেয়ে লাভজনক হবে তামাকের ব্যবসা। এ কারণে তামাকের দিকে ঝুঁকি।  স্বাধীনতার আগে  তামাক বাংলাদেশে চাষ হতো না। পাকিস্তানের মারদান থেকে আসতো। ওই সময় পুরান ঢাকার রহমতগঞ্জে, বেচারাম দেউরী, নারায়াণগঞ্জে ও আরমানীটোলায় তামাক রাখার গুদাম ছিল। স্বাধীনতার পর সাড়ে ৩ লাখ মন তামাক কিনেছিলাম। ৭০ টাকা মন দরে তামাক কিনে পরে বিক্রি করেছি ৯০০ টাকা মন। এমনকি ওই সময় চৌমুহনী তাজ বিড়ির মালিক ১ হাজার ৫০ টাকা মন দরে ১ হাজার ২০০ মন তামাক নিয়েছিল আমার কাছ থেকে। তামাকের ব্যবসা থেকেই মাথায় আসে জর্দা উৎপাদনের কথা

জর্দা ছাড়া আর কী কী ব্যবসা করেছেন?

হাজী মো. কাউছ মিয়া: ১৯৫০ সালে স্টেশনারি দিয়ে শুরু করি। পরে ১৯৫৫-৫৬ সালে শুরু করি তামাকের ব্যবসা। ১৯৬৫ সালে ভোলার লালমোহন থেকে প্রতি মন দেড় টাকা দরে ১১ মন তেতুল কিনেছিলাম। পরে চাঁদপুরে এনে সেই তেতুল ১ হাজার ২০০ টাকা দরে বিক্রি করি। ১৯৭৩ সালেও ৭০/৮০ টাকায় তামাক কিনে গুদামজাত করে পরে ৮০০/৯০০ টাকায় বিক্রি করি। ওই সময় বিড়ি, সিগারেট ছাড়াও টিস্যু পেপার, ওয়াল পেপার, পারফিউম, টিন এবং পরবর্তী সময়ে রডও কেনা-বেচার ব্যবসা করেছি।

হাকীমপুরী জর্দা শুরু হলো কবে থেকে?

হাজী মো. কাউছ মিয়া:  ২০ বছর (১৯৫০ থেকে ১৯৭০) চাঁদপুরের ব্যবসা গুটিয়ে চলে আসি নারায়ণগঞ্জের নিতাই গঞ্জে। সেখানেও ১৮টি কোম্পানির সোল এজেন্ট হিসেবে কাজ করি। ১৯৭৩ সালে নারায়ণগঞ্জে তামাক ব্যবসা শুরু করি। ওই বছরই ৩/৪ জন শ্রমিক নিয়ে শুরু করি শান্তিপুরী জর্দার ব্যবসা। এর পর ১৯৭৮ সালে নারায়ণগঞ্জ ছেড়ে ঢাকায় এসে হাকীমপুরী জর্দার ব্যবসা শুরু করি।

কত সালে ঢাকায় আসেন?

হাজী মো. কাউছ মিয়া: ১৯৮০ সালে ঢাকা এসে আগা নওয়াব দেউরী রোডে কারখানা ভাড়া নেই। ৩/৪ জন শ্রমিক দিয়ে শুরু করি হাকীমপুরী জর্দার ব্যবসা। এটি ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত কুঠির শিল্প হিসেবে বিবেচিত ছিল। ১৯৯৯ সালের জুনে জর্দার ওপর ভ্যাটারোপ করা হলো।

হাকীমপুরী জর্দার বর্তমান পরিস্থিতি কী?

হাজী মো. কাউছ মিয়া:  জব্বার ক্যামিক্যাল নামে ১৯৭৬ সালে হাকীমপুরী জর্দার ব্যবসা শুরু হলেও লাইসেন্স নেওয়া হয় ১৯৮৬-৮৭ সালে। কাউছ ক্যামিক্যাল নামে এটির লাইসেন্স নেওয়া হয়েছে। ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত হাকীমপুরী জর্দা সরকারকে ভ্যাট দিত বছরে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা। বর্তমানে প্রতি মাসে ভ্যাট দেওয়া হচ্ছে ৪০ থেকে ৪৫ লাখ টাকা। প্রতি মাসে প্রায় ৬ লাখ হাকীমপুরী জর্দা বিক্রি হচ্ছে।

শুনেছি আপনি ব্যাংক থেকে কোনও ঋণ নেননি। বিষয়টি কি সত্য?

হাজী মো. কাউছ মিয়া: ঠিকই শুনেছেন, আজ পর্যন্ত ব্যাংক থেকে আমি একটাকাও ঋণ নেইনি।  বরং কয়েকটি ব্যাংকের শাখা চলছে আমার রাখা এফডিআরে।

আপনার পড়ালেখার বিষয়টি যদি বলেন।

হাজী মো. কাউছ মিয়া: ১৯৩৬ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় মধুবাবুর স্কুলে (বর্তমান মধুসূদন হাই স্কুল) ভর্তি হই। ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত পড়াশোনা করেছি। তখন আমি ৮ম শ্রেণিতে পড়ি। এর পর আর পড়ালেখা করা সম্ভব হয়নি।

আপনার পারিবারিক পরিচয় যদি বলেন।

হাজী মো. কাউছ মিয়া: ১৯৩১ সালের ২৬ আগস্ট আমার জন্ম। বাবা আলহাজ আব্বাস আলী মিয়া ছিলেন ব্যবসায়ী। জমিদার ছিলেন আমার নানা মৌলভী আবদুস সালাম। আমরা ১১ ভাই ১ বোনের মধ্যে আমি ছিলাম সপ্তম। আমি ৮ ছেলের জনক।

Facebook Comments

এ সংক্রান্ত আরো খবর




সম্পাদক: আরিফা রহমান

২৮/এফ ট্রয়োনবী সার্কুলার রোড, ৫ম তলা, মতিঝিল, ঢাকা।
সর্বক্ষণিক যোগাযোগ: ০১৭১১-০২৪২৩৩
ই-মেইল ॥ sangbad24.net@gmail.com
© 2016 allrights reserved to Sangbad24.Net | Desing & Development BY PopularITLtd.Com, Server Manneged BY PopularServer.Com