ads

আমরা সবাই একত্রিত হয়ে আমাদের বাণিজ্য আরো বাড়াতে পারি

শেখ হাসিনা

সংবাদ২৪.নেট ডেস্ক

সার্কের প্রতিষ্ঠাতা বাংলাদেশ। কিন্তু চলতি বছর পাকিস্তানে অনুষ্ঠেয় সার্ক সম্মেলন থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়া দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। সার্কের কি ইতি ঘটতে যাচ্ছে?

না, যেমনটা প্রত্যাহার নিয়ে আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে আমরা বলেছি, আমরা মনে করছি যে এ বিশেষ সময়ে সার্ক অঞ্চলে যে পরিবেশ বিরাজ করছে, তা সার্ক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার জন্য সহায়ক নয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি অব বাংলাদেশ) নিয়ে বাংলাদেশের নির্দিষ্ট কিছু সংবেদনশীলতা রয়েছে, যেখানে পাকিস্তান আমাদের প্রক্রিয়া নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিল, এমনকি নিজেদের পার্লামেন্টেও তারা এ ইস্যু উত্থাপন করেছিল। অগ্রহণযোগ্য মন্তব্য করার মাধ্যমে পাকিস্তান আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেছিল। পাকিস্তানের এমন আচরণ আমাদের অনুভূতিতে আঘাত করেছে, কারণ এটা আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। আমরা আমাদের দেশের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করছি, এটা নিয়ে তো তাদের মাথাব্যথা হওয়ার কথা নয়। এমন আচরণের জন্য পাকিস্তানের সঙ্গে সব ধরনের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য আমার ওপর প্রচুর চাপ রয়েছে। কিন্তু আমি বলেছি, এ সম্পর্ক বজায় থাকবে এবং আমাদের নিজেদেরই সমস্যা সমাধান করতে হবে। বিষয়টি হলো, আমরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে জয় লাভ করেছি এবং তারা হলো পরাজিত শক্তি। আমরা মুক্তিযুদ্ধে জয় লাভ করেছি এবং পাকিস্তানের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করেছি— এটা সাধারণ কথা যে তারা এটি ভালোভাবে মেনে নেবে না।

পাকিস্তান থেকে উৎপন্ন সন্ত্রাস কি আপনার কাছে প্রধান ইস্যু ছিল না? উরি হামলার পর বলতে গেলে প্রায় একই সময়ে বাংলাদেশ, ভুটান, আফগানিস্তান ও ভারত সার্ক সম্মেলন থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়। মনে হচ্ছে পাকিস্তানকে একঘরে করে ফেলতে এটা করা হয়েছে…
পাকিস্তানে সৃষ্ট পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে আমরা সার্ক সম্মেলন থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নিই। সেখানে সন্ত্রাসবাদের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সাধারণ জনগণ এবং এ সন্ত্রাস সবদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। এজন্য আমাদের অনেকেই পাকিস্তান নিয়ে হতাশ। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সমস্যা রয়েছে এবং আমি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না। উরি হামলার জন্য ভারত নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছে। কিন্তু চলতি বছরের সার্ক সম্মেলন থেকে বাংলাদেশের নাম প্রত্যাহার করে নেয়ার কারণ সম্পূর্ণ ভিন্ন।

অন্য পারের সন্ত্রাসীদের হত্যা করার জন্য এলওসি অতিক্রম করে পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে হামলা পরিচালনার ভারতীয় সিদ্ধান্তকে কি আপনি সমর্থন করেন?
আমি মনে করি, উভয় দেশের এলওসির অলঙ্ঘনীয়তা বজায় রাখা উচিত এবং এটি শান্তি আনবে।

কিন্তু আপনি কি এ নীতি সমর্থন করেন? গত বছরও ভারত সন্ত্রাসীদের ধরতে সীমান্ত অতিক্রম করে মিয়ানমারে প্রবেশ করেছিল। ভারত কী বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একই পদক্ষেপ নিতে পারে?
আমার মনে হয়, আপনাদের সরকার ও প্রধানমন্ত্রীর কাছে আপনার এ প্রশ্নগুলো করা উচিত হবে। আমি মনে করি, সীমান্ত অর্থাৎ এলওসি-সংক্রান্ত বিধিবিধান ও নিয়মাবলি অবশ্যই প্রত্যেকটি দেশের মেনে চলা উচিত।

আমি জিজ্ঞেস করেছি কারণ ২০০৯ সালে আপনি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক মজবুত করতে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আপনার সরকারের কঠোর অবস্থান সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আপনার সরকার সন্ত্রাসীদের আস্তানাগুলো গুঁড়িয়ে দিয়েছে, ২০ জনের অধিক মোস্ট ওয়ান্টেড সন্ত্রাসী হস্তান্তর করেছে বাংলাদেশ। আজকের দিনে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সহযোগিতার মানে কী?
দেখুন, আমি বিশ্বাস করি, সন্ত্রাসকে বাংলাদেশে খুঁটি গাড়তে দেয়া উচিত হবে না। যাদের সঙ্গে আমাদের সীমান্ত রয়েছে তা হোক ভারত কিংবা মিয়ানমার— ২০০৮ সাল থেকে আমরা যেসব পদক্ষেপ নিয়েছি, তার ফলাফল আপনি দেখতে পারেন। আগে আমাদের সীমানা বরাবর প্রতিদিনই সহিংসতা, বোমা বিস্ফোরণ, সন্ত্রাসের মতো ঘটনা ঘটত এবং এখন আমরা এগুলো নিয়ন্ত্রণ করেছি। অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী হামলা চালানোর জন্য আমরা আমাদের মাটি কোনো সন্ত্রাসীকে ব্যবহার করতে দেব না। বাংলাদেশ এখন আর সন্ত্রাসবাদ রফতানিকারক দেশ নয়, অস্ত্র চোরাচালানের জন্য সিল্করুটও নয়, যা আগে কোনো এক সময় ছিল।

চলতি বছরে হলি আর্টিসানে সন্ত্রাসী হামলা কীভাবে আপনার সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে বদলে দিয়েছে?
সন্ত্রাসবাদ এখন একটি বৈশ্বিক সমস্যা। এর বিরুদ্ধে যুদ্ধে আমি কিছু ভিন্ন পদক্ষেপ নেয়ার চেষ্টা করছি। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য আমি স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের কাজে লাগাচ্ছি। এর পর মাতা-পিতাদের বলছি তাদের সন্তানরা কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, সে বিষয়ে খেয়াল রাখতে। আমরা মসজিদ ও মাদ্রাসার আলেমদের বলেছি, ইসলাম যে একটি শান্তির ধর্ম, সে বিষয়ে শিক্ষা দিতে এবং কেউ যেন সহিংসতার কথা না বলে তা নিশ্চিত করতে। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সচেতনতা ও সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে আমরা আমাদের সন্তানদের সন্ত্রাসী হওয়া থেকে রক্ষা করতে পারব।

কয়েক দিন আগে আপনি ঢাকেশ্বরী মন্দিরে হিন্দু সম্প্রদায়ের সঙ্গে আলাপচারিতায় ধর্মীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের কথা বলেছিলেন। আপনি এখন যেসব মৌলবাদী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিচ্ছেন, তাদের হাতে আগেই অনেক হিন্দু ও ব্লগারকে প্রাণ দিতে হয়েছে। এ পদক্ষেপ নিতে এত সময় লাগল কেন?
এটা সত্য নয়। সন্ত্রাসী কার্যক্রমের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়া প্রথম দেশ বাংলাদেশ। তদন্তে সময় লাগে; শুধু এখানে নয়, সব দেশেই। কিন্তু আমরা ওইসব হত্যার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে দেরি করেছি— এটা বলা ন্যায্য হবে না।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো বিচার বহির্ভূত হত্যা ও গুমের মতো সন্ত্রাসী কার্যক্রম করছে। এসব অভিযোগ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য কী?

খুব দুঃখজনক যে, মানবাধিকার সংস্থাগুলো ভুক্তভোগীর অধিকার রক্ষার চেয়ে অপরাধীদের রক্ষায় অধিকতর সোচ্চার। যুক্তরাষ্ট্রে কী ঘটছে? সেখানে যখনই কোনো স্কুল কিংবা অন্যত্র হামলা হয়, তখন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কী করে? তারা কি হামলাকারীদের হত্যা এবং মানুষকে উদ্ধার করে না? আমাদের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কি তাদের ওপর সন্ত্রাসীদের আক্রমণ প্রতিহত করবে না?

হলি আর্টিসানে হামলার পর আপনার সরকার বলেছিল, তারা স্থানীয় এবং তাদের সঙ্গে আইএসের সংযুক্ততা নেই। কিন্তু যখন দেখা যায় প্রধান সন্দেহভাজনকে আইএস প্রশিক্ষণ দিয়েছে, তখন সেটাকে কীভাবে অস্বীকার করবেন?

হতে পারে তাদের কেউ কেউ আইএস দ্বারা প্রভাবিত, তবে সংগঠন আকারে বাংলাদেশে আইএসের কোনো ভিত্তি নেই। কারো কাছে যদি এখানে (বাংলাদেশে) আইএসের ক্যাম্প আছে এমন প্রমাণ থাকে, তাদের উচিত আমাদের সেই প্রমাণ দেয়া। আমরা হলি আর্টিসান হামলাকারীদের চিহ্নিত করেছি। তারা কোথা থেকে এসেছে আমরা জানি এবং তারা সবাই স্থানীয়।

যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি না দেয়ার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দাবি উঠেছে। ৪৫ বছর পর দেয়া এসব ফাঁসি কি বাংলাদেশের জন্য ‘অবশেষে কষ্টের অবসান হলো’ (সেন্স অব ক্লোজার) অনুভূতি তৈরি করছে?

অবশ্যই। ১৯৭১ সালে তারা বেসামরিক মানুষদের হত্যা করেছে, দুই লাখের বেশি নারীর সম্ভ্রমহানি করেছে, গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছে। ওই সময় যারা এসব অত্যাচারের সম্মুখীন হয়েছে, তাদের জাতীয় দাবি ছিল— ওই সব অপরাধীদের অবশ্যই বিচারের আওতায় আনতে হবে।

আপনি বলছেন, এটা জনগণের দাবি। তবে অনেক জামায়াত নেতাদের ফাঁসি হয়েছে বা জেলে রয়েছেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) অনেক নেতাকে গ্রেফতার করা হয়েছে অথবা অনেকে বিদেশে পালিয়ে গেছেন প্রসিকিউশন থেকে রক্ষা পেতে। আপনি নিজের রাজনৈতিক রেষারেষির সঙ্গে যুদ্ধাপরাধীর বিচারকে গুলিয়ে ফেলছেন না তো?

না, এটা আমার রাজনৈতিক রেষারেষির বিষয় নয়। একটি স্বাধীন দেশে আপনি যদি স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন, তবে কীভাবে এসব স্বাধীনতাবিরোধী নেতাকে সমর্থন করেন? বিএনপি এসব যুদ্ধাপরাধীকে পৃষ্ঠপোষকতা করেছে। বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে করা মামলাগুলো আলাদা। তারা যে দুর্নীতি বা অপরাধ করেছে, এগুলো তা সংশ্লিষ্ট। এসব নেতা যদি দোষী না হন, তবে তাদের উচিত দেশ ছেড়ে পালিয়ে না গিয়ে আদালতে বিচারের সম্মুখীন হওয়া। আমি যখন বিরোধী দলে ছিলাম, তখন তারা আমার বিরুদ্ধে এক ডজন মিথ্যা মামলা দায়ের করেছিল।

বিএনপি ২০১৪ সালের নির্বাচন শুধু বয়কটই করেনি, তারা নাশকতার চেষ্টাও চালিয়েছিল। তাদের নেতাকর্মীরা পোলিং বুথ করা স্কুলগুলোয় আগুন দিয়েছিল, নির্বাচনী কর্মকর্তাদের ওপর হামলা করেছিল, বাস ও ট্রেন ভাংচুর করেছিল। ২০১৫ সালেও নিজেদের দাবি আদায়ের জন্য তারা তিন মাস সন্ত্রাসী কার্যকলাপ চালিয়েছে, হত্যা করেছে ২৫০ জনের বেশি মানুষ। তাই তাদের অবশ্যই আইনের সম্মুখীন হতে হবে। এগুলো কোনো রাজনৈতিক মামলা নয়, বরং ফৌজদারি মামলা।

১৯৯৬ সালে বাংলাদেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে এনেছেন। এখন কোনো বিরোধী দল ছাড়া আপনি সংসদে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। আপনি কি মনে করেন পরবর্তী নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় বিএনপিকে আনতে পারবেন?

বিএনপি নিজ থেকেই গত নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমি বিএনপি সভানেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে টেলিফোন করেছি, তিনি আমার কল রিসিভ করেননি। আমার বাবা তার স্বামী জেনারেল জিয়াউর রহমানকে প্রমোট করেছেন। তখন থেকেই আমরা পরস্পরকে চিনি, জানি। তিনি প্রায় সময় খারাপভাবে কথা বলেন। এমনকি তার ছেলের মৃত্যুতে সমবেদনা জানাতে গেলে তিনি দুয়ার বন্ধ রেখেছেন, আমাকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেননি। তিনি তার দলের কর্মীদের আন্দোলন করার আদেশ দিয়েছেন, সহিংসতা চালিয়ে যেতে বলেছেন। মানুষ হিসেবে আমি আর কী করতে পারি? এটা তার দোষ যে, তিনি নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আশা রাখি, পরবর্তীতে একই ভুল তিনি আর করবেন না।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা গণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যদিও একজন স্বনামখ্যাত সম্পাদককে গ্রেফতার, মুক্তিযুদ্ধের অবমাননায় কঠোর শাস্তির বিধান রেখে নতুন ডিজিটাল আইন প্রণয়নসহ সাম্প্রতিক কিছু কর্মকাণ্ড এ বার্তা দিচ্ছে যে আপনি গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চান…

আমরা যখন ক্ষমতায় আসি, তখন বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ছিল শুধু একটি। এখন আমাদের আছে ২৩টি টেলিভিশন চ্যানেল। কারা এটা করেছে? কয়েকশ সংবাদপত্র প্রকাশের অনুমতি কারা দিয়েছে? আমাকে বলুন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা না থাকলে কোনো স্বাধীনতা নেই— এ কথাটি লেখার স্বাধীনতা কোথা থেকে আসে? আমরা অন্য অপরাধে সম্পাদককে (ম্যাগাজিন সম্পাদক শফিক রেহমান, যাকে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় গ্রেফতার করা হয়) গ্রেফতার করেছি। দেশের বিরুদ্ধে কাজ করলে অবশ্যই তাকে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। দেখুন, বাংলাদেশে আরো অনেক সম্পাদক আছেন, তাদের কয়জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে?

ভারতে অনুষ্ঠিতব্য ব্রিকস-বিমসটেক সম্মেলনকে কেন্দ্র করে চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং বাংলাদেশ সফর করছেন। ভারতের দিক থেকে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ভারতের সম্পর্কের নতুন দুয়ার উন্মোচনের পরও কেন বাংলাদেশ-চীনের তুলনায় বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য পিছিয়ে পড়ছে?

আসলে ভারতের সঙ্গে আমাদের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের প্রভূত উন্নয়ন ঘটেছে, বিশেষ করে ২০০৭-০৮ সালে ভারত তাদের বাজারে আমাদের পণ্য শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার সুবিধা দেয়ার পর থেকে। অতীতে আমরা ভারত থেকে প্রচুর খাদ্যপণ্য কিনেছি, কিন্তু এখন আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য কমার এটি একটি কারণ হতে পারে। তবে এখন ভারত থেকে বিপুল পরিমাণে মূলধনী পণ্য, যন্ত্রপাতি ও সুতা আমদানি করছি আমরা। ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক অনেক ভালো এবং সেটা অব্যাহত থাকবে।

বাংলাদেশ-ভারতের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ৬-৭ বিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশ-চীন দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের চেয়ে কম…

এটা ব্যক্তিখাতের ওপর নির্ভর করে আসলে কোথা থেকে তারা পণ্য কিনতে চায়। বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে বিদ্যমান বিপুল বাণিজ্যবৈষম্য সম্পর্কেও কথা হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে এবং এ পর্যায়ে যেসব বাণিজ্য বাধা আছে, সেগুলো দূর করা উচিত। ভারতের জন্য মংলা ও ভেড়ামারায় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণের পরিকল্পনা আছে আমাদের, যাতে বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগপ্রবাহ (এফডিআই) বাড়ে এবং উভয় দেশের বাণিজ্য ব্যবধান কমে।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা অংশীদার চীন। চীনের ‘ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড’ উদ্যোগের সঙ্গে বাংলাদেশ রয়েছে। এ অঞ্চলে বাংলাদেশ চীন কথিত ‘স্ট্রিং অব পার্লসের’ অংশ হওয়া কি ভারতের দিক থেকে বৈধ উদ্বেগের কারণ নয়?

আপনি বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সুসম্পর্কের কথা বলেছেন। মনোভাব এটা হলে বাংলাদেশ অধিকতর চীনের দিকে ঝুঁকছে— এ অভিযোগ আপনি কীভাবে করতে পারেন? কখনো পারেন না। এক্ষেত্রে আমাদের নীতি খুব পরিষ্কার। আমাদের সবার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক আছে এবং সেটা বজায় রাখতে চাই। ব্যক্তিগতভাবে আমি বিশ্বাস করি, এ সুসম্পর্কের ক্ষেত্রে সংযোগ (কানেক্টিভিটি) একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বিরাট অংশ। বিবিআইএন নেটওয়ার্ক আমরা স্থাপন করেছি এবং এর ফলে ভুটান, ভারত ও নেপালের সঙ্গে আমাদের ভালো সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। উপরন্তু আমাদের চীন, ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে অর্থনৈতিক করিডোরও আছে। কাজেই আমরা সবাই একত্রিত হয়ে আমাদের বাণিজ্য আরো বাড়াতে পারি। যার অর্থ হলো, আমাদের জনগণের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়ন। আমাদের জনগণের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ছে। এবং এ অঞ্চলে এর থেকে সবচেয়ে বেশি সুফলভোগী হবে কে? অবশ্যই ভারত। বাংলাদেশী বাজার থেকে সর্বোত্তম সুবিধা পেতে যাচ্ছে ভারত। আপনাকে এটা বুঝতে হবে।

চলতি সপ্তাহে ব্রিকস-বিমসটেক সম্মেলন উপলক্ষে আপনি ভারত সফর করছেন এবং আশা করা হচ্ছে, এ বছরের শেষের দিকেও ভারতে দ্বিপক্ষীয় সফরে আসবেন। আপনি এসব সফর থেকে কী আশা করেন?

এ অঞ্চলে আমাদের সবার সমস্যা প্রায় একই। আমাদের সবার একটা সাধারণ শত্রু আছে এবং তা হলো— দারিদ্র্য। আমাদের অবশ্যই দারিদ্র্য মোকাবেলায় লড়াই করতে হবে। পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের অনেক সমস্যা থাকতে পারে, তবে সেসব সমাধান হবে বলেই আমার বিশ্বাস। বাংলাদেশ-ভারত সেটা করে দেখিয়েছে, যেমনটা আমরা গঙ্গা পানি চুক্তিতে সম্মত হয়েছি। ব্রিকস সম্মেলনে আমাদের প্রত্যাশা হলো, নতুন উন্নয়ন ব্যাংকসহ বিমসটেককে এগিয়ে নিতে ব্রিকস নেতারা সহযোগিতার হাত প্রশস্ত করবেন।

স্থল সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে ছিটমহল বিনিময়ের পর অবৈধ অভিবাসন ও সীমান্তে গুলিবর্ষণের মতো অন্য সমস্যা রয়ে গেছে। ভারত সফরে কি আপনি উন্নত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা করবেন?

হ্যাঁ, স্থল সীমান্ত চুক্তি ছিল একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা, যা আমরা ৪৫ বছর পর সমাধান করেছি। কাজেই এমন বড় সমস্যার সমাধান করতে পারলে আমরা ছোট সমস্যাগুলোও সমাধান করতে পারব। সীমান্ত হত্যা একটি উদ্বেগের বিষয় হওয়ায় উভয় দিক থেকে বিজিবি ও বিএসএফ যৌথভাবে ঘটনাগুলোর তদন্ত করতে সম্মত হয়েছে। সম্প্রতি বিএসএফ সদস্যরা গুলি করেছে এবং বাংলাদেশের নিরপরাধ গ্রামবাসীকে হত্যা করেছে। এ বিষয় নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। এসব ছোটখাটো কিছু সমস্যা থাকবে। তবে দেখুন কত সুন্দরভাবে মানুষ ও স্থল সীমানা বিনিময়ের মাধ্যমে আমরা বিশ্বের কাছে একটা বড় ও অসাধারণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছি।

এখনো আপনার দ্বিপক্ষীয় সফরের তারিখ নিশ্চিত হয়নি। তিস্তা পানি চুক্তি সম্পন্ন হলেই কি আপনি ভারতে আসবেন?
না, না, (হাসি) এটার ওপর কোনো শর্ত নেই। এমনকি কোনো রাষ্ট্রীয় সফর ছাড়াও আমি আপনাদের দেশে গিয়েছি। রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির স্ত্রীর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় আমি ভারতে গিয়েছি। তার মৃত্যু সংবাদ পেয়ে আমি দ্রুত ছুটে গিয়েছি, কারণ ১৯৭৫ সালে নির্বাসনে থাকাকালে তিনি আমাদের জন্য অনেক কিছু করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারত আমাদের জনগণের জন্য অনেক কিছু করেছে, তারা আমাদের শরণার্থীদের যত্ন-আত্তি করেছে, তারা আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে। কাজেই যেখানে আপনাদের সঙ্গে আমাদের এমন বন্ধন আছে, সেখানে আপনি এমন প্রটোকলের কথা চিন্তা করতে পারেন না। প্রতিবেশীর ঘর হিসেবে আমি যেকোনো সময় সেখানে (ভারত) যেতে পারি।

সার্কের এই স্থগিতাবস্থায় গ্রুপ আকারে বিমসটেকের বেশি অগ্রগতি হবে বলে মনে করেন?
না। সার্ক হলো একটি দক্ষিণ এশীয় গ্রুপ এবং সেটি এখনো আছে। ১৯৯৭ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বঙ্গোপসাগর ঘিরে অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সংলগ্ন দেশগুলো নিয়ে বিমসটেক গঠনের প্রতিষ্ঠাতা ছিলাম আমি। মোদিজি সেটি এগিয়ে নিয়ে গেছেন এবং তার কাছে আমি কৃতজ্ঞ। তবে একটি গ্রুপের বিকল্প হিসেবে অন্য গ্রুপকে আমি দেখি না।

শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার
[ভারতের দ্য হিন্দুতে প্রকাশিত সাক্ষাৎকার]

শেখ হাসিনা: গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী

ভাষান্তর হুমায়ুন কবির ও আবু সাঈদ

Facebook Comments

এ সংক্রান্ত আরো খবর




সম্পাদক: আরিফা রহমান

২৮/এফ ট্রয়োনবী সার্কুলার রোড, ৫ম তলা, মতিঝিল, ঢাকা।
সর্বক্ষণিক যোগাযোগ: ০১৭১১-০২৪২৩৩
ই-মেইল ॥ sangbad24.net@gmail.com
© 2016 allrights reserved to Sangbad24.Net | Desing & Development BY Popular-IT.Com, Server Manneged BY PopularServer.Com