ads

বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে আইন কী বলে ও আমাদের বর্তমান অবস্থা

বায়ুদূষণ

সংবাদ২৪.নেট ডেস্ক

আমাদের বায়ুমণ্ডল যেসব গ্যাসীয় উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত, তার মধ্যে অন্যতম— নাইট্রোজেন ও অক্সিজেন। বায়ুমণ্ডলে নাইট্রোজেন ও অক্সিজেনের পরিমাণ যথাক্রমে ৭৮ দশমিক শূন্য ৯ ও ২০ দশমিক ৯৫ শতাংশ। উভয় গ্যাসের সম্মিলিত পরিমাণ ৯৯ শতাংশের অধিক। অবশিষ্ট ১ শতাংশের কিছু কম যেসব গ্যাসীয় উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত তা হলো— আর্গন শূন্য দশমিক ৯৩ ও কার্বন ডাই-অক্সাইড শূন্য দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। তাছাড়া বায়ুমণ্ডলে ১ শতাংশের অতিক্ষুদ্র অংশ হিসেবে নিয়ন, হিলিয়াম, মিথেন, ক্রিপটন, হাইড্রোজেন, জেনন ও ওজোনের উপস্থিতি রয়েছে। বায়ুমণ্ডলের নিম্নভাগে অঞ্চলভেদে রয়েছে বিভিন্ন মাত্রার জলীয়বাষ্পের উপস্থিতি। সাধারণত বৃষ্টিপ্রবণ এলাকায় জলীয়বাষ্পের উপস্থিতি শতভাগ। যেসব অঞ্চলে বৃষ্টির পরিমাণ কম সেখানে তুলনামূলক হারে জলীয়বাষ্পের পরিমাণও কম। বাতাসে জলীয়বাষ্পের পরিমাণ বেশি থাকলে মানুষের শরীর থেকে নিগর্ত পানি, যেটিকে ঘাম বলা হয়, তা সহজে শুকায় না। বাতাসে জলীয়বাষ্পের আধিক্যের কারণে ঘাম না শুকানো মানুষের জন্য অস্বস্তিদায়ক। বায়ুমণ্ডলের নিম্নভাগে ধুলাবালির উপস্থিতি একে দূষিত করে তোলে। সমুদ্র-তীরবর্তী স্থানে প্রবাহিত বায়ু জলরাশি অতিক্রম করে আসায় তা ধুলাবালিমুক্ত ও নির্মল থাকে। উঁচু পবর্তবেষ্টিত এলাকা বরফ অথবা বৃক্ষরাজি দ্বারা আবৃত থাকায় সেখানকার বায়ু সমুদ্র-তীরবর্তী বায়ুর ন্যায় ধুলাবালিমুক্ত ও নির্মল থাকে। এসব কারণে সমুদ্র-তীরবর্তী অঞ্চল ও উঁচু পর্বতবেষ্টিত এলাকা স্বাস্থ্যকর স্থান হিসেবে ভ্রমণপিপাসুদের কাছে প্রিয়।

মানুষসহ বিশ্বের অপরাপর প্রাণিকুলের জীবনধারণের জন্য অক্সিজেন অপরিহার্য। মানুষ প্রতিনিয়ত তার চারপাশের বায়ুমণ্ডল থেকে অক্সিজেন গ্রহণ করছে এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড ত্যাগ করছে। অক্সিজেন ছাড়া একজন মানুষের পক্ষে ৩-৪ মিনিটের অধিক বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। যেকোনো জীবন্ত প্রাণীর জন্য নাইট্রোজেন অতি গুরুত্বপূর্ণ। এটি প্রাণীর দেহে প্রোটিন গঠনে সহায়তা করে। মানুষের দেহের ত্বক ও চুলের গঠনে নাইট্রোজেনের অনন্য ভূমিকা রয়েছে। আমাদের জন্য প্রয়োজনীয় নাইট্রোজেন আমরা উদ্ভিদ থেকে পাই। অন্যদিকে উদ্ভিদ মাটির সঙ্গে সংমিশ্রিত ব্যাকটেরিয়া থেকে নাইট্রোজেন সংগ্রহ করে। মানুষ প্রতিনিয়ত অক্সিজেন গ্রহণও কার্বন ডাই-অক্সাইড ত্যাগের কারণে বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইডের যে হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটছে, তার ভারসাম্য উদ্ভিদের কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণ ও অক্সিজেন ত্যাগের মাধ্যমে প্রাকৃতিকভাবে রক্ষিত হয়ে চলছে। এ কারণে বিশ্বের ভূভাগে ন্যূনতম চার ভাগের এক ভাগ বনাঞ্চল থাকার আবশ্যকতা রয়েছে। বিশ্বের সম্পদশালী ও জনবসতি কম এমন দেশগুলোয় এ হার বজায় রাখতে পারলেও দরিদ্র ও ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোর পক্ষে তা সম্ভব হয়ে ওঠে না। আর এ কারণেই আমাদের দেশে বনাঞ্চলের পরিমাণ কাঙ্ক্ষিত পরিমাণের চেয়ে অনেক নিম্নে।

বিশ্বের যেকোনো দেশের গ্রামাঞ্চলের তুলনায় শহরাঞ্চল ও শিল্পাঞ্চল ঘনবসতি ও কোলাহলপূর্ণ হওয়ায় শেষোক্ত অঞ্চলদ্বয়ে বায়ুদূষণ অধিক। এসব অঞ্চলে গাড়ি-ঘোড়া ও কলকারখানা থেকে নির্গত ধোঁয়া এবং রান্নাঘর থেকে নির্গত ধোঁয়া একদিকে বায়ুমণ্ডলের কার্বনের উপস্থিতির বৃদ্ধি ঘটাচ্ছে, অন্যদিকে বায়ুমণ্ডলের উষ্ণতা বৃদ্ধি করে চলেছে। উভয় দূষণের কারণে শহরাঞ্চল ও শিল্পাঞ্চলে বসবাসরত জনমানুষ বিশুদ্ধ ও নির্মল বায়ুর প্রভাব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

রেলগাড়ির প্রচলনের পর এটি স্টিম ইঞ্জিনচালিত ছিল। এ ধরনের ইঞ্জিনে জ্বালানি হিসেবে খনিজ কয়লা ব্যবহার হতো। স্টিম ইঞ্জিন ব্যাপকভাবে বায়ুদূষণ করার কারণে ধীরে ধীরে এর ব্যবহার কমে এসে বর্তমানে শূন্যে পৌঁছেছে। এখন বিশ্বের কোথাও রেলগাড়িতে স্টিম ইঞ্জিনের ব্যবহার নেই। আমাদের দেশে রেলগাড়িতে স্টিম ইঞ্জিন ব্যবহারকালীন রেলে ভ্রমণ মোটেও স্বস্তি ও আরামদায়ক ছিল না। স্টিম ইঞ্জিনচালিত রেলে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ভ্রমণ-পরবর্তী দেখা যেত— পরিধেয় বস্ত্রের মধ্যে ইঞ্জিনের ধোঁয়া হতে নির্গত কয়লার ক্ষুদ্রাতি অংশের উপস্থিতি এ বস্ত্রকে ধোয়া ব্যতীত পুনরায় পরিধানের অনুপযোগী করে তুলত। স্টিম ইঞ্জিনের ব্যবহার উঠে যাওয়ায় বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও বর্তমানে এর ঠাঁই হয়েছে দর্শনীয় বস্তু হিসেবে জাদুঘর অথবা রেল ভবনের সম্মুখে।

সমুদ্র ও নদীপথে অতীতে স্টিম ইঞ্জিনচালিত জাহাজের ব্যাপক প্রচলন ছিল। বর্তমানে সমুদ্র বা নদীপথে স্টিম জাহাজ নেই বললেই চলে। স্টিম জাহাজে রেলের স্টিম ইঞ্জিনের মতো কয়লা প্রধান জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার হতো। ডিজেল ইঞ্জিনচালিত জাহাজ পরিবেশবান্ধব ও অধিক সুবিধাজনক হওয়ার কারণে এবং এর ক্ষতিকর প্রভাব তুলনামূলকভাবে স্টিম ইঞ্জিনের চেয়ে অনেক কম হওয়ায় এটি দ্রুত স্টিম ইঞ্জিনের স্থান দখল করে নেয়।

সড়কে যেসব যান্ত্রিক যান চলাচল করে, এগুলো গ্যাসচালিত হলে তুলনামূলকভাবে পেট্রল ও ডিজেলচালিত যানবাহনের চেয়ে দূষণ কম ঘটায়। আমাদের দেশে কোনো এক সময় বেবিট্যাক্সি বা অটোরিকশায় জ্বালানি হিসেবে মবিল ও ডিজেলের মিশ্রণ ব্যবহার করা হতো। এ ধরনের মিশ্রিত জ্বালানি ব্যাপক কালো ধোঁয়া উত্পন্ন করত। আমাদের রাজধানী শহর ঢাকায় এ ধরনের জ্বালানিচালিত বেবিট্যাক্সি প্রচলনকালীন সারা শহর সকাল থেকে রাত অবধি ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন থাকত। ধোঁয়ার আচ্ছন্নতা ঢাকা শহরের পরিবেশকে অসহনীয় করে তুলেছিল। এ দেশের জনমানুষের দাবির মুখে আমাদের নীতিনির্ধারকরা ডিজেল ও মবিলের মিশ্রণে জ্বালানিচালিত বেবিট্যাক্সির ব্যবহার নিষিদ্ধ করায় ঢাকা শহর দ্রুত ধোঁয়ামুক্ত হয়ে জনজীবনে স্বস্তি বয়ে আনে। বর্তমানে ঢাকা শহরে যেসব যান্ত্রিক যান চলাচল করে এগুলোর মধ্যে পণ্যবাহী ট্রাক ব্যতীত অন্যগুলো গ্যাসচালিত হওয়ায় ধোঁয়াজনিত বায়ুদূষণ অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে।

জ্বালানি হিসেবে খনিজ কয়লার দাম ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলের চেয়ে কম হওয়ায় এবং এটির মজুদ অভ্যন্তরীণ উেস পর্যাপ্ত থাকায় অনেক দেশ দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুত্ উত্পাদনে খনিজ কয়লাকে প্রধান জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে আসছিল। কিন্তু বৈষ্ণিক উষ্ণায়ন ও বিশ্বব্যাপী এর ক্ষতিকর প্রভাবের কারণে শিল্পোন্নত দেশগুলো মূল্যসাশ্রয়ী হওয়া সত্ত্বেও খনিজ কয়লাচালিত তাপবিদ্যুেকন্দ্রগুলোয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রতিস্থাপনের পথে রয়েছে। ঠিক এমন সময় দেখা গেল, আমাদের দেশের একটি ও ভারতের একটি প্রতিষ্ঠান যৌথ উদ্যোগে বিশ্বঐতিহ্য সুন্দরবনের সন্নিকটে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন খনিজ কয়লাচালিত তাপবিদ্যুেকন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে চলেছে। এ বিদ্যুেকন্দ্র স্থাপন করা হলে এর ২৫০ মিটার চিমনি থেকে নির্গত গ্যাসীয় বর্জ্যের তাপমাত্রা হবে ১২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা প্রকারান্তরে পার্শ্ববর্তী এলাকার তাপমাত্রা বৃদ্ধি করে পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এ বিদ্যুেকন্দ্রে কয়লা পোড়ানোর কারণে প্রতিদিন আর্সেনিক, পারদ, সিসা, নিকেল, ভেনাডিয়াম, বেরেলিয়াম, বেরিয়াম, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম, সিলেনিয়াম, রেডিয়ামসহ আরো প্রচুর বিষাক্ত পদার্থসমৃদ্ধ যে ফ্লাই অ্যাশ ও বটম অ্যাশ উত্পাদন হবে তা কোথায় অপসারণ করে নিষ্ক্রিয় করা হবে— সে বিষয়ে দেশবাসীকে প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা এখনো আশ্বস্ত করতে পারেননি। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, প্রকল্পটি থেকে বিদ্যুত্ উত্পাদন শুরু হলে প্রতিদিন ১০ হাজার টন কয়লা পোড়ানোর কারণে ১৪২ টন বিষাক্ত সালফার ডাই-অক্সাইড ও ৮৫ টন নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড উত্পন্ন হবে। বছরব্যাপী বিদ্যুত্ উত্পাদন অব্যাহত থাকলে ৪৭ লাখ ২০ হাজার টন কয়লা পোড়ানোর কারণে সাড়ে সাত লাখ টন ফ্লাই অ্যাশ পাওয়া যাবে। আর মাটি-পানিতে যাবে দুই লাখ টন বটম অ্যাশ। এ বিপুল পরিমাণ অ্যাশ বাতাস, পানি, মাটিতে পড়বে। এতে পরিবেশ হবে দারুণভাবে বিপর্যস্ত এবং ইকোসিস্টেম মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে।

আমাদের দেশে নির্মাণসামগ্রী হিসেবে পাথর ইটের তুলনায় ব্যয়বহুল। পৃথিবীর যেসব দেশে ভূভাগের উপরের স্তরে পাথর রয়েছে, এসব দেশ প্রাকৃতিক উত্স থেকে পাথর সংগ্রহ করে নির্মাণকাজ সমাধা করে। আমাদের দেশে প্রাকৃতিক উত্স থেকে সংগৃহীত পাথর অপ্রতুল হওয়ায় নির্মাণকাজে ইটের ব্যবহার অধিক হচ্ছে। ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে খনিজ কয়লার ব্যবহার অনুমোদিত হলেও জ্বালানি কাঠের ব্যবহার অনুমোদিত নয়। খনিজ কয়লার মূল্য জ্বালানি কাঠ থেকে বেশি হওয়ায় অধিকাংশ ইটভাটার মালিক আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও প্রশাসনের সহায়তায় এতে খনিজ কয়লার পরিবর্তে জ্বালানি কাঠ ব্যবহার করে অধিক মুনাফা অর্জনের পথ সুগম করছেন। আইন অনুযায়ী শহরাঞ্চল ও লোকালয়ের আশপাশে ইটভাটা স্থাপন অনুমোদিত না হলেও আমাদের দেশে এমন কোনো ইটভাটা নেই, যা লোকালয় থেকে অনতিদূরে। ইটভাটায় জ্বালানি কাঠের ব্যবহার আমাদের বনভূমির দ্রুত হ্রাস ঘটিয়ে যেমন বায়ুদূষণে সহায়ক হিসেবে কাজ করছে, অনুরূপ ইটভাটা থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া বায়ুদূষণ আরো তীব্রতর করছে। ইটভাটায় ইট, বালি ও সিমেন্টমিশ্রিত অধিক উচ্চতার চিমনি ব্যবহারের বিধান থাকলেও এটি নির্মাণ ব্যয়বহুল হওয়ার কারণে অনেক ইটভাটার মালিক এখনো পুরনো ড্রাম দিয়ে নির্মিত চিমনি ব্যবহার করছেন।

দেশে শহরাঞ্চলের গৃহস্থালি বর্জ্য অপসারণ ব্যবস্থা বিজ্ঞাপসম্মত পন্থায় গড়ে না ওঠায় শহরের যেসব অঞ্চলে গৃহস্থালি বর্জ্য প্রাথমিকভাবে রাখা হয়, সেগুলোয় বর্জ্যের পরিমাণ ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত হওয়ায় এবং বর্জ্য উন্মুক্ত অবস্থায় রাখায় যে অসনীয় দুর্গন্ধ ছড়ায়, তা আশপাশের বাযুমণ্ডল দূষিত করে তোলে। এ ধরনের দূষিত বায়ু দ্বারা শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ করা হলে তা যেকোনো মানুষের শারীরিক অস্বস্তির কারণ হয়ে দেখা দেয়। তাছাড়া বর্জ্য উন্মুক্ত ট্রাকে দিনের বেলায় পরিবহন করায় রাস্তায় চলাচলকারী জনমানুষের স্বচ্ছন্দে চলার ক্ষেত্রে ব্যাঘাত ঘটে। আমাদের বর্জ্য অপসারণ স্থল শহরের সন্নিকটে হওয়ায় তা আশপাশে বসবাসরত জনমানুষের স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত করে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোয় কখনো বর্জ্য প্রাথমিক স্থানে উন্মুক্ত রাখা হয় না এবং এগুলো সবসময় ঢাকনাযুক্ত গাড়িতে রাতের শেষ প্রহরে পরিবহন করা হয়। এসব দেশে অপসারণস্থলও শহর থেকে অনেক দূরে জনবসতিহীন এলাকায় হয়। অধুনা অনেক উন্নত দেশ গৃহস্থালি বর্জ্য বিদ্যুত্ ও সার উত্পাদনে ব্যবহার করছে। আমাদের দেশে অনুরূপ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে তা বায়ুদূষণ রোধে সহায়ক হবে।

সবচেয়ে দূষিত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ১০ম। আর বায়ুদূষণের দিক দিয়ে বিশ্বের ১৭৮টি দেশের মধ্যে সবচেয়ে পেছনে বাংলাদেশের অবস্থান। আট বিষয় বিবেচনা করে ১০০ স্কেলে বাংলাদেশের স্কোর ২৫ দশমিক ৬১। আর কেবল বায়ুদূষণের কথা বিবেচনা করলে বাংলাদেশের স্কোর ১০০-এর মধ্যে মাত্র ১৩ দশমিক ৮৩। আর অবস্থান সবার শেষে, অর্থাত্ ১৭৮ নম্বরে। তবে জনস্বাস্থ্য, পয়োনিষ্কাশন ও কৃষি খাতের চিত্রে সামান্য উন্নতি করেছে বাংলাদেশ। গত এক যুগে দূষণ ও পরিবেশের বিচারে বাংলাদেশ পিছিয়েছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫-এর ৬ নং ধারায় বলা আছে— “(১) স্বাস্থ্য হানিকর বা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর ধোঁয়া বা গ্যাস নিঃসরণকারী যানবাহন চালানো যাইবে না বা উক্তরূপ ধোঁয়া বা গ্যাস নিঃসরণ বন্ধ করার লক্ষ্যে পরীক্ষা করার উদ্দেশ্য ব্যতীত অন্য কোনভাবে উক্ত যানবাহন চালু করা যাইবে না। এই উপ-ধারায় ‘স্বাস্থ্য হানিকর বা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর ধোঁয়া বা গ্যাস’ অর্থ বিধি দ্বারা নির্ধারিত মান মাত্রা অতিক্রমকারী ধোঁয়া বা যে কোন গ্যাস। (২) উপ-ধারা (১) এর উদ্দেশ্য পূরণকল্পে মহাপরিচালক বা তাহার নিকট হইতে ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি যে কোন যানবাহন যে কোন স্থানে পরীক্ষা করিতে বা চলমান থাকিলে উহাকে থামাইয়া তাত্ক্ষণিকভাবে পরীক্ষা করিতে, এইরূপ পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সময়ব্যাপী আটকাইয়া রাখিতে (detain) বা উক্ত উপ-ধারা লঙ্ঘনকারী যানবাহন ও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র আটক করিতে (seize) বা উহার পরীক্ষাকরণ বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিতে পারিবেন। (৩) উপ-ধারা (২) এর অধীনে তাত্ক্ষণিকভাবে কোন যানবাহন পরীক্ষা করা হইলে উক্ত পরীক্ষার রিপোর্ট আদালতে সাক্ষ্য হিসাবে গ্রহণযোগ্য হইবে। (৪) উপ-ধারা (১) এর বিধান বা উপ-ধারা (২) এর অধীন প্রদত্ত নির্দেশ লঙ্ঘনের জন্য সংশ্লিষ্ট যানবাহনের চালক, বা ক্ষেত্রমত, মালিক বা উভয় ব্যক্তি দায়ী থাকিবেন।”

বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ অনুযায়ী পরিবেশ দূষণকারীদের বিরুদ্ধে প্রথম অপরাধের জন্য এক থেকে দুই বছর কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। পরবর্তী প্রতিটি অপরাধের ক্ষেত্রে দুই থেকে ১০ বছর কারাদণ্ড বা ২ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। এদিকে অভিযোগ উঠেছে, আইনের যথাযথ প্রয়োগ না থাকায় শব্দদূষণের পাশাপাশি বায়ুদূষণের মাত্রাও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বায়ুমণ্ডলে ধুলাবালির উপস্থিতি স্বচ্ছন্দে ও সাবলীলভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণের অন্তরায়। আমাদের দেশে শহরাঞ্চলে বছরব্যাপী এবং গ্রামাঞ্চলে শুষ্ক মৌসমে ধুলাবালির ব্যাপক উপদ্রব দেখা দেয়। এ ধরনের ধুলাবালিযুক্ত বায়ু প্রতিনিয়ত আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাসে ব্যাঘাত ঘটিয়ে বিভিন্ন রোগের উদ্ভব ঘটাচ্ছে।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলো বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনমানুষের জন্য সহায়ক ও অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিতে অনবদ্য অবদান রেখে চলেছে। আমরা এ পথে উন্নত দেশের ন্যায় সফলতা না পাওয়ায় আমাদের দেশের সামগ্রিক বায়ুমণ্ডলের পরিবেশ সুস্বাস্থ্যের জন্য এখনো নিরাপদ হয়ে উঠতে পারেনি। আর যত দিন পর্যন্ত এটি নিরাপদ না হবে, তত দিন বায়ুদূষণ আমাদের উন্নত ও সমৃদ্ধিশালী এবং স্বাভাবিক জীবনযাপনে অন্তরায় হয়ে থাকবে। এক্ষেত্রে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করার মাধ্যমে বায়ুদূষণ বন্ধে উদ্যোগ নিতে হবে।-বণিক বার্তা

লেখক: সাবেক জজ, সংবিধান, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক

iktederahmed@yahoo.com

Facebook Comments

এ সংক্রান্ত আরো খবর




সম্পাদক: আরিফা রহমান

২৮/এফ ট্রয়োনবী সার্কুলার রোড, ৫ম তলা, মতিঝিল, ঢাকা।
সর্বক্ষণিক যোগাযোগ: ০১৭১১-০২৪২৩৩
ই-মেইল ॥ sangbad24.net@gmail.com
© 2016 allrights reserved to Sangbad24.Net | Desing & Development BY PopularITLtd.Com, Server Manneged BY PopularServer.Com